মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য নিষেধাজ্ঞা ও কড়া হুঁশিয়ারিকে এক প্রকার খোলাখুলি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সোমবার ইরানে নতুন করে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল ওয়াশিংটনকে একটি শক্ত বার্তা দেয়া।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে আমেরিকার তৈরি করা শান্তি আলোচনার টেবিল থেকে ইসরাইলকে যেভাবে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে, এই সামরিক পদক্ষেপের মাধ্যমে তেল আবিব আসলে সেই আলোচনার টেবিলে নিজেদের একটি স্থায়ী আসন নিশ্চিত করতে চাইছে।
গত এপ্রিল মাসে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর এই প্রথম ইরানের মাটিতে সরাসরি কোনো আঘাত হানল ইসরাইল। লেবাননের রাজধানী বৈরুতে ইসরাইলের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবে ইসরাইলি ভূখণ্ড লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুঁড়েছিল তেহরান।

আর তার পাল্টা জবাব হিসেবেই সোমবার ইরানের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায় তেল আবিবের প্রতিরক্ষা বাহিনী। যদিও সোমবার দুই পক্ষই ট্রাম্পের কড়া নির্দেশের পর সাময়িকভাবে এই গোলাগুলি বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে, তবে পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে যেখানে যে কোনো মুহূর্তে আবারও পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।
ইসরাইলের হিব্রু ইউনিভার্সিটির সামরিক ইতিহাসবিদ ড্যানি ওরবাখ এই পরিস্থিতির বিশ্লেষণ করে বলেন, এই হামলার মাধ্যমে ইসরাইল ওয়াশিংটনকে স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, ইসরাইলের স্বার্থকে উপেক্ষা করে ইরানের সাথে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি করা সম্ভব নয়। কারণ, আমেরিকা যদি ইসরাইলি স্বার্থকে খুব বেশি পদদলিত করতে চায়, তবে ইসরাইল পুরো আলোচনার টেবিলই উল্টে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে ইসরাইলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এই যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু গত কয়েক মাসে তিনি ইসরাইলকে সম্পূর্ণ একপাশে সরিয়ে রেখে ইরানের সাথে একটি কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য একতরফা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রতিনিয়ত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এমন কোনো পদক্ষেপ না নিতে চাপ দিচ্ছেন যা শান্তি আলোচনাকে ভেস্তে দিতে পারে। এমনকি গত মার্চ মাসে হিজবুল্লাহকে নির্মূল করার দোহাই দিয়ে ইসরাইল যেভাবে লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করেছিল, সেখানেও যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে নেতানিয়াহুকে বাধ্য করছেন ট্রাম্প। অন্যদিকে, ইরানও সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে লেবাননে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি না হলে তারা ওয়াশিংটনের সাথে কোনো শান্তি চুক্তিতে সই করবে না।
গত সপ্তাহে ট্রাম্পের সাথে এক উত্তপ্ত ফোনালাপের পর বৈরুতে বিমান হামলা স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছিলেন নেতানিয়াহু। পরে ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করেন যে, ওই তপ্ত ফোনালাপে তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে আক্ষরিক অর্থেই চরম পাগল’ বলে গালি দিয়েছিলেন, যদিও তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এখনও ভালো বলেই দাবি করেন ট্রাম্প। এই ঘটনার পর ইসরাইলের অভ্যন্তরেই নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা শুরু হয়।
সমালোচকদের দাবি, আলোচনার টেবিলে কোনো আসন না পেয়েও কেবল আমেরিকার আলোচনা টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীকে গুটিয়ে রেখে নেতানিয়াহু আসলে দেশের সার্বভৌমত্ব আমেরিকার পায়ে বন্ধক রেখেছেন।

রোববার লেবাননে ইসরাইলের হামলা এবং তার জবাবে ইসরাইলে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষণের পর ট্রাম্প গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস-কে বলেছিলেন, উভয় পক্ষই তো নিজেদের শখ মিটিয়ে নিয়েছে! ইসরাইল একটা চড় মেরেছে, ইরানও পাল্টা একটা চড় মেরেছে। আমাদের আর নতুন কোনো হামলার প্রয়োজন নেই।
কিন্তু ইসরাইলি নীতিনির্ধারকরা ট্রাম্পের এই ‘টিট-ফর ট্যাট’ বা সমতার নীতি মেনে নিতে পারেননি। ইসরাইলের একজন শীর্ষস্থানীয় প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ইসরাইল কোনোভাবেই এমন পরিস্থিতি মেনে নিতে পারে না যেখানে লেবাননে ইসরাইলি হামলার জবাবে ইসরাইলের মূল ভূখণ্ডে ইরানের আঘাত করাটাকে আন্তর্জাতিকভাবে একটি ‘ন্যায়সঙ্গত পাল্টা জবাব’ হিসেবে গণ্য করা হবে।
ইরানে সোমবারের এই হামলা চালানোর আগে নেতানিয়াহু তাঁর শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন, যার মূল লক্ষ্য ছিল এই স্বল্পমেয়াদী সামরিক উত্তেজনার আড়ালে নিজেদের কৌশলগত উদ্দেশ্য হাসিল করা।
ওই প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা এবং আলোচনার সাথে যুক্ত আরও দুই কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ইসরাইলের প্রধান লক্ষ্য হলো এটি প্রতিষ্ঠা করা, ভবিষ্যতে মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি হলেও দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালানোর এবং সেখানে ইসরাইলি সেনা রাখার যে একক অধিকার, তা থেকে ইসরাইলকে কোনো ভাবেই বঞ্চিত করা যাবে না। এখন দেখার বিষয়, নেতানিয়াহুর এই অবাধ্যতা ট্রাম্প কীভাবে সামাল দেন!
