ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর দিন থেকেই লোহিত সাগরে পশ্চিমাদের যমদূত হয়ে আছে ইয়েমেনের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথকে অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি অস্থিতিশীল করে তুলেছে তারা।
হুথি যোদ্ধারা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ মিসাইল আর ড্রোন দিয়ে লোহিত ও এডেন উপসাগরে পশ্চিমা সব জাহাজ লক্ষ্য করে একের পর এক হামলা চালিয়ে আসছে গোষ্ঠীটি। বড় হুমকি হয়ে ওঠা হুথিদের নিরস্ত্র করতে তাই এবার সেরা অস্ত্রই ব্যবহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কি সেই সেরা অস্ত্র?
সম্প্রতি ইয়েমেনে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা হুথিদের অস্ত্রাগার লক্ষ্য করে একটি সিরিজ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার সন্ধ্যায় সংঘটিত এই হামলায় হুথি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো অত্যাধুনিক বি-টু স্টিলথ বম্বার বিমান ব্যবহার করেছে মার্কিন বাহিনী। পেন্টাগণ নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
স্টিলথ বম্বারের ব্যবহার খুব বেশি একটা দেখা যায় না। সবশেষ উপায় হিসেবে বিশেষ ধরনের এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করে পেন্টাগন।
প্রতিষ্ঠানটি বলছে, হুথিদের অত্যাধুনিক অস্ত্রের মজুদ ধ্বংসের জন্য স্টিলত বম্বার দিয়ে সিরিজ বোমা হামলা ছাড়া আর কোন উপায় ছিলো না। আর হামলার অনুমতি দিয়েছেন বাইডেন।
ফলে আবারও আলোচনায় স্টিলথ বম্বার। কেন এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বোমারু বিমান বলা হচ্ছে? গত শতকের নম্বই দশকে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হিসাবে যাত্রা শুরু করে স্টিলথ বম্বার তৈরির প্রকল্প। এই বম্বার তৈরির প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো শক্রর চোখকে ফাঁকি দিয়ে ব্যাপক আকারে বোমা হামলা চালানো।
স্টিলথ প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের একটি গোপন প্রযুক্তি হিসেবেও পরিচিত। এটি এমন এক ধরনের অগ্রসর প্রযুক্তি যা রাডার, ইনফ্রারেড, সোনার এবং অন্যান্য শনাক্তকরণ পদ্ধতিকে ফাঁকি দিতে পারে। এই প্রযুক্তির মূল উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুর নজর এড়িয়ে চলা। এটি অনেক বেশি বোমা ও মিসাইল বহনে সক্ষম।
স্টিলথ বম্বারের সবচেয়ে সংস্করণটি দুই বছর আগে উন্মোচন করে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনী। বি-টোয়েন্টি ওয়ান রেইডার নামে বিমানটি বলা হচ্ছে, পরবর্তী-প্রজন্মের দূরপাল্লার কৌশলগত বোমারু বিমান। এটি নির্মাণে ২০১০ সালে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলারের বাজেট অনুমোদন করে আমেরিকার সরকার।
ইউক্রেন যুদ্ধের অস্থিরতার মধ্যেই রহস্য আর গোপনীয়তার চাদরে ঢাকা বাদুরের মতো দেখতে ‘বি-টোয়েন্টি ওয়ান রেইডার’ স্টিলথ বম্বারটি প্রকাশ্যে আনার সিদ্ধান্ত নেয় মার্কিন বিমান বাহিনী। নির্মাতা কোম্পানি নরথ্রপ গ্রুমানের দাবি, সর্বকালের সর্বাধুনিক সামরিক বিমান এই ‘বি-টোয়েন্টি ওয়ান রেইডার’।
অত্যাধুনিক রাডারের চোখ ফাঁকি দেয়ার সক্ষমতার জন্য সামরিক খাতে আলাদা কদর আছে স্টিলথ প্রযুক্তির বিমানের। সামরিক বিমানে এই প্রযুক্তির প্রথম কার্যকর প্রয়োগকারী হিসেবে, তিন দশক ধরে আন্তর্জাতিক আকাশ সীমায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে পেরেছে মার্কিন সামরিক বাহিনী।
নরথ্রপ গ্রুমান স্টিলথ বম্বার নির্মাণের কাজ শুরুর পর বছরের পর বছর ধরে এর নকশা ও নির্মাণ প্রক্রিয়া নিয়ে কঠোর গোপনীয়তা অবলম্বন করা হয়েছে। বি-টোয়েন্টি ওয়ান রেইডারের পূর্বসূরী স্টিলথ বোমারু বিমান ‘বি-টু স্পিরিট’-এর নকশাও করেছিল নরথ্রপ গ্রুমান।
একবারে ২০ টন বোমা বা বিধ্বংসী অস্ত্র বহনের সক্ষমতা আছে ‘বি-টু স্পিরিট’-এর। স্পেস ডটকমের দাবি, পাইলটসহ এবং কো-পাইলট ছাড়া ওড়ার সক্ষমতা আছে নতুন স্টিলথ বোমারু বিমানটির। প্রচলিত বোমা ছাড়াও পরমাণু অস্ত্র বহন করে হামলা চালানোর সক্ষমতা আছে এটির।
আকাশ থেকে গুপ্তচরের মতো নজরদারি চালানো, রাডার জ্যাম করাও প্রতিপক্ষের যোগাযোগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির সক্ষমতা স্টিলথ বম্বারকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা। এজন্য এটিকে বলা হয় নিঃশব্দ ঘাতক। দেখতে প্রায় বাদুরের মতো। রংও কালো। বাদুরের মতোই আকাশে উড়তে পারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা।
স্টিলথ বম্বারের নকশা করা হয়েছে- ওপেন সিস্টেম আর্কিটেকচার প্রক্রিয়ায়। অর্থাৎ প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে নতুন স্টিলথ বম্বারের অভ্যন্তরীণ প্রযুক্তি আপগ্রেড করার সুযোগ আছে। নরথ্রপ গ্রুমানের অ্যারোনটিক্স সিস্টেম বলেছে, এই বিমানটি সর্বাধুনিক উদ্ভাবনী শক্তি ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলাফল।
কোম্পানিটি আরও জানিয়েছে, তাদের পামডেলের কারখানায় নির্মাণ প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে আছে ছয়টি নতুন ধরনের স্টিলথ বম্বার। মার্কিন বিমানবাহিনী ২০২৩ সালেই জানিয়ে রেখেছিলো স্টিলথ বম্বারের আরও কিছু নতুন সংস্করণ আসতে যাচ্ছে। তবে তার লক্ষ্যবস্তু কী হবে, সে বিষয়ে কোনো আভাস দেয়নি।