ইরানের মাটিতে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যার পর ইসরাইল জানিয়েছিলো তাদের পরের নিশানা হবেন ইয়াহিয়া সিনওয়ার। বৃহস্পতিবার ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, গাজায় তাদের হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন। এই ব্যক্তিদের মধ্যে একজন সম্ভবত সিনওয়ার। তবে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। নিহত ব্যক্তিদের পরিচয় যাচাই করা হচ্ছে।
এর আগেও চারবার সিনওয়ারকে হত্যার দাবি করেছিলো ইসরাইল। কিন্তু প্রতিবারই ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ফিরে এসে জানান দিয়েছেন, সিনওয়ার বেঁচে আছেন।

ইসরাইলি দাবির পর হামাস থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। হামাস সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট আল-মাজদে বলেছে, সিনওয়ার বিষয়ে জানতে ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম নয়; বরং হামাসের কাছ থেকে তথ্য আসা পর্যন্ত সবাইকে অপেক্ষা করতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, সিনওয়ারের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া যায় তাহলে, তা হামাসের জন্য হবে বড় আরেকটি ধাক্কা। ইসরাইলের সাম্প্রতিক হামলায় হামাসের সাবেক প্রধানসহ শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা নিহত হয়েছেন। হানিয়া নিহত হবার পর সিনওয়ারই হামাসের দায়িত্ব তুলে নেন নিজের কাঁধে। দায়িত্ব নিয়ে তিনি হামাসের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাঠামোর নতুন করে সাজিয়ে তোলেন।

ইসরাইল মনে করে, গত বছরের সাত অক্টোবর ইসরাইলে হামাসের ‘আল আকসা ফ্লাড’ অভিযানের আসল পরিকল্পনাকারী সিনাওয়ার। হামাস নেতা সিনওয়ার দীর্ঘদিন ইসরাইলের কারাগারে ছিলেন। কাতারের দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মোহাম্মদ এলমাসরি বলেন, সিনওয়ারকে হত্যার খবর যদি শেষ পর্যন্ত সত্য বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে হামাসকে একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
তবে, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো ও মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ নাতাশা হ্যাল বলেছেন, অ্যামেরিকা আর কবে বুঝবে যে, নেতাদের মেরে দিলেও হামাসের মতো মতাদর্শ শেষ হয়ে যায় না। তারা আবার নতুন করে শুরু করে। হিজবুল্লাহ ও হামাসের ক্ষেত্রে অতীতে এটাই হয়েছে। বিশ্বজুড়ে অন্য অনেক গ্রুপের ক্ষেত্রে এটা হয়েছে। তারা আবার নিজেদের সংগঠিত করেছে।

নাতাশা বলেন, কোনো সন্দেহ নেই, হামাস দুর্বল হয়েছে, নেতৃত্বে শূন্যতা দেখা দিয়েছে, তারপরেও হামাস নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। এরপর যে হামাসের নেতৃত্ব দেবে, সে তো সিনওয়ারের থেকে অনেক বেশি নির্মম হতে পারে। আর, বৃহস্পতিবার জার্মানিতে পৌঁছার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, সিনওয়ারের মৃত্যুর পর বন্দি হস্তান্তর ও যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বেড়ে গেলো।
পশ্চিমারা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে বিবেচনা করলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ব্যাপক জনপ্রিয় ইয়াহিয়া সিনওয়ার। কে এই সিনওয়ার? তরুণ বয়স থেকেই সম্পৃক্ত তিনি হন ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের সঙ্গে। নেতৃত্ব দেন ইহুদিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে। ইসরাইলি সেনাদের হাতে গ্রেফতার হয়ে ২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কারাগারে ছিলেন তিনি। পরে বন্দি বিনিময় চুক্তির অধীনে মুক্তি পান সিনওয়ার।

১৯৬২ সালে গাজার খান ইউনিসে জন্মগ্রহণ করা সিনওয়ারকে প্রায়ই হামাসের সবচেয়ে আপসহীন শীর্ষ নেতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। ১৯৮০-র দশকের শুরুতে গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি ইসরাইলের দখলদারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেন। গ্র্যাজুয়েশন শেষ হবার পরই সিনওয়ার ইসরাইলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য একটি যোদ্ধা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন।
সেই যোদ্ধা দলটিই পরবর্তী সময়ে হামাসের সামরিক শাখা আল কাসাম ব্রিগেডে পরিণত হয়। ১৯৮৭ সালে শেখ আহমেদ ইয়াসিন হামাস প্রতিষ্ঠার পরই সিনাওয়ার সংগঠনটিতে যোগ দেন। পরের বছরই ইসরাইলি বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে। তার বিরুদ্ধে দুজন ইসরাইলি সেনা ও চারজন গুপ্তচরকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। তাকে চারটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেয়া হয়, যার মোট পরিমাণ ছিলো ৪২৬ বছর।

তিনি ২০ বছরেরও বেশি সময় ইসরাইলের বিভিন্ন কারাগারে কাটান। বন্দি থাকাকালীন সহবন্দিদের মধ্যেই নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশ করেন। কারাবাসে তিনি হামাসের মতাদর্শ নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করেন। ২০১১ সালে মুক্তির পর সিনাওয়ার হামাসের উচ্চপদে বসেন। তিনি সংগঠনের রাজনৈতিক শাখায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন এবং ২০১৭ সালে হামাসের গাজা শাখার প্রধান নির্বাচিত হন।
সিনওয়ারের নেতৃত্বে হামাস বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক স্থাপন করে এবং গাজার প্রশাসনিক কার্যক্রমে অনেক পরিবর্তন আনে। সিনাওয়ারের নেতৃত্বে হামাস ইসরাইলের বিরুদ্ধে বেশ কিছু সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে ২০১৪ সালের গাজা যুদ্ধ অন্যতম। এই যুদ্ধের সময় তার সামরিক কৌশল এবং পরিকল্পনা বিশ্ব মনোযোগ আকর্ষণ করে। পরের বছর সিনাওয়ারকে ‘বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ হিসেবে তকমা দেয় যুক্তরাষ্ট্র।

২০১৭ সালে সিনাওয়ার হামাসের গাজা শাখার প্রধান হন। তার আগে ইসমাইল হানিয়া ওই পদে ছিলেন। হানিয়া সে বছরই হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। তার মানে, সিনাওয়ার যেভাবে হানিয়ার পর গাজা প্রধান হয়েছিলেন, একইভাবে হানিয়ার পর এবার তিনি হামাস প্রধানও হলেন।
হানিয়াহ গত বছরের ৭ অক্টোবরের পর থেকে নিহত হবার আগ পর্যন্ত গাজা যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ভ্রমণ করেন। যুদ্ধ নিয়ে বক্তৃতা দেন। কিন্তু সিনাওয়ার গাজা যুদ্ধ শুরু হবার পর আত্মগোপনে চলে যান। তবে মাঝে মধ্যেই তিনি প্রকাশ্যে এসে বিশ্ব মনোযোগ কেড়ে নিতেন। ২০২১ সালের এক সাক্ষাৎকারে সিনাওয়ার বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিরা যুদ্ধ চায় না। তবে তারা আগে ‘সাদা পতাকা ওড়াবে না’।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে আমরা শান্তিপূর্ণ গণপ্রতিরোধের চেষ্টা করেছি। আমরা আশা করি যে, বিশ্ববাসী, মুক্ত মানুষেরা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো আমাদের জনগণের পাশে দাঁড়াবে। ইসরায়েলি দলখলদারদের হত্যাকাণ্ড থেকে আমাদের জনগণকে বাঁচাবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বিশ্ব শুধু চেয়ে চেয়ে দেখছে।
হামাসপ্রধান ইয়াহিয়া সিনওয়ারকে হত্যার দাবি ইসরাইলের
থাড: দক্ষ ও দুর্ধর্ষ ক্ষেপণাস্ত্র বিধ্বংসী সমরাস্ত্র 