এবার টেলিভিশনের লাইভে এসে দারুণ এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হলেন পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিনা রাব্বানি খার। এর আগেও ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মর্গ্যানের টকশোতে গণতন্ত্র এবং জঙ্গিদের মদত দেয়া নিয়ে প্রশ্নের উত্তর না দিতে পেরে অনুষ্ঠান থেকে বেরিয়ে যান হিনা।
কাতারভিক্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাতে লাইভে এসে প্রায়ই একই কাণ্ড করে বসলেন পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বারা নিষিদ্ধ এক জঙ্গি নেতাকে সাধারণ মানুষ হিসাবে আখ্যায়িত করে ফেঁসে যান হিনা। সংবাদ উপস্থাপক ব্যক্তির পরিচয় সম্পর্কে তথ্য উপাত্ত দিলে বিব্রতবোধ করেন তিনি।
গেলো ৭ মে পাকিস্তানের ভেতরে বেশ কয়েকটি অভিযুক্ত স্থাপনায় ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে এক বিমান অভিযান পরিচালনা করে ভারত। দিল্লি দাবি করে, অপারেশন সিঁদুর চলার সময় বিমান হামলায় বেশ কয়েকজন সন্ত্রাসী নিহত হন। নিহত সন্ত্রাসীদের এক জানাজায় নেতৃত্ব দেন হাফিজ আবদুর রউফ।
এই ব্যক্তি পাকিস্তানভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জৈশ-ই-মোহাম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারের ছোট ভাই হাফিজ আবদুর রউফ। ভারতের দাবি অপারেশন সিঁদুরে আজহারের পরিবারের অন্তত ১৪ জন মারা গেছে। মাসুদের নিহত পরিজনের জানাজায় তাঁর ভাই হাফিজ আবদুর রউফের হাজির থাকার ছবি ভাইরাল হয়।
সেই ছবিটি দেখিয়ে উপস্থাপক হিনা রাব্বানিকে দেখালে তিনি বলেন, ছবিতে যে ব্যক্তিকে দেখানো হচ্ছে তিনি একজন সাধারণ পাকিস্তানি, নিষিদ্ধ সন্ত্রাসী হাফিজ আবদুর রউফ নন। তখন উপস্থাপক জানান, এই ছবিকে অস্বীকার করেনি পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। তখন হিনা বলেন, সন্ত্রাসী রউফকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। এ কারণে সাধারণ এক ব্যক্তিকে রউফ হিসাবে দাবি করা হয়েছে।
কান্দাহার প্লেন হাইজ্যাক, ২০০১ সালে দিল্লিতে পার্লামেন্ট অ্যাটাক, ২০১৬ সালের পাঠানকোট এবং ২০১৯ সালের পুলওয়ামায় নাম জড়ানো রউফ ‘লস্কর–ই–তৈয়বা’র অন্যতম মাথা। আমেরিকার নিষিদ্ধ জঙ্গিদের তালিকায় নামও রয়েছে তার। নিহতদের শেষকৃত্যে রউফের উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়ে পাকিস্তান।
এই বিতর্কের আবহে নিজেদের মুখ বাঁচাতে ইসলামাবাদে সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানি সেনার মুখপাত্র, লেফটেন্যান্ট জেনারেল আহমেদ শরিফ চৌধুরী দাবি করেন, ছবিতে যাকে দেখা যাচ্ছে, সেই রউফ নেহাতই একজন সংসারী, নিরীহ মানুষ। সন্ত্রাসের সঙ্গে তার কোনো যোগ নেই।
আল জাজিরার লাইভে ঠিক একই দাবি করেন হিনা রাব্বানি। তিনি পাকিস্তানের দাবিকে আরও জোর করার চেষ্টা করেন। বলেন, অপারেশন সিঁদুরে নিহত সন্ত্রাসীদের জানাজার নেতৃত্বদানকারী কেবল একজন সাধারণ পাকিস্তানি মানুষ ছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ কুখ্যাত বিশ্ব সন্ত্রাসী নন।
হিনা বলেন, আমি আপনাকে দায়িত্ব ও প্রমাণসহ বলছি, এই ব্যক্তির পরিচয় নিয়ে ভারতের দাবি সঠিক নয়। এই ব্যক্তিটি ভারত যাকে দাবি করছেন, তিনি নন।
পাকিস্তানে লাখ লাখ আবদুর রউফ আছে। তখন তাকে জানানো হয়, রউফের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর, আর যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক নিষিদ্ধ রউফের পরিচয়পত্রের নম্বর এক। হিনা মুখ বাঁচানোর চেষ্টা করে বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই ব্যক্তিকে (ভাইরাল ছবিতে) রক্ষা করছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সেই ব্যক্তিকে রক্ষা করছে না, যাকে যুক্তরাষ্ট্র নিষিদ্ধ করেছে।
পাকিস্তানি রাজনীতিবিদ বলেন, আইএসপিআর (পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ) স্পষ্টভাবে বলেছে যে এটি একই ব্যক্তি নয়, এবং আপনি এখানে বসে আমাকে বলেছেন যে তারা কেবল তাকে রক্ষা করেছেন এবং বলেননি যে এটি একই ব্যক্তি নয়।
আবদুর রউফকে নিয়ে পাকিস্তানের মিথ্যা দাবি
রউফের জানাজায় উপস্থিত থাকার ছবি প্রকাশ পাওয়ার সাথে সাথেই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তাকে ‘সাধারণ মানুষ’ বলে অভিহিত করে। এই প্রক্রিয়ায়, পাকিস্তানের আইএসপিআর-এর মহাপরিচালক আহমেদ শরীফ চৌধুরী দাবি করেন, অপারেশন সিন্দুরের সময় পাকিস্তানের পাঞ্জাবের মুদ্রিকে অবস্থিত লস্কর-ই-তৈয়বার সদর দপ্তরে নিহত সন্ত্রাসীদের নামাজে ইমামতি করা ব্যক্তি একজন ধর্মপ্রচারক এবং পাকিস্তান মারকাজি মুসলিম লীগ (পিএমএমএল) দলের সদস্য ছিলেন।
তিনি রউফের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও প্রকাশ করেন, যার মধ্যে তার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরও অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সন্ত্রাসীদের তালিকার ডাটাবেসের সাথে মিলে যায়। আইএসপিআর থেকে দেয়া পরিচয়ের বিবরণ হাফিজ আবদুর রউফের বিবরণের সাথে সম্পূর্ণ মিলে যায়।
রউফ ১৯৯৯ সাল থেকে লস্করের সিনিয়র নেতৃত্বের সদস্য এবং ফালাহ-ই-ইনসানিয়াত ফাউন্ডেশনের প্রধান, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিষিদ্ধ তালিকায় রয়েছেন। রউফ হাফিজ সাঈদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন, যাকে প্রায়শই তার সান্নিধ্যে দেখা যায়।