বাংলার লড়াকু লালমাটি, রবিঠাকুরের মাটি। এই মাটি থেকেই বাংলা ভাষা রক্ষায় দ্বিতীয় পর্বের সংগ্রাম শুরু করলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
পূর্বঘোষণা মতো সোমবার (২৮ জুলাই) দুপুরে বোলপুরের টুরিস্ট লজ মোড় থেকে মিছিল শুরু করেন তিনি। হাতে রবিঠাকুরের ছবি, বাংলা বর্ণমালা, নেপথ্যে প্রয়াত প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের অবিস্মরণীয় গান 'আমি বাংলায় গান গাই।'
মিছিলে মমতার সঙ্গী বীরভূমের দলীয় সাংসদ শতাব্দী রায়, বোলপুরের অসিত মাল, রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, জেলায় দলের কোর কমিটির সদস্যরা। দেখা গেল, দীর্ঘ চার কিলোমিটার পথের দু'পাশে ঘিরে থাকা জনতার উদ্দেশে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাত নাড়িয়ে অভিবাদন গ্রহণ করছেন মুখ্যমন্ত্রী।
ভিনরাজ্যে বাঙালি হেনস্তার প্রতিবাদে পথে নেমেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মিছিল শেষে নাম না করে মোদিকে একহাত নিলেন মমতা। বললেন, 'নেতাজি-শহিদ-স্বরাজদীপকে ভুলে গেলেন?' এরপরই ভিনরাজ্যে হেনস্তার শিকার হওয়া বাঙালিদের ঘরে ফেরার পরামর্শ দিলেন তিনি। বললেন, 'আমি অর্ধেক রুটি খেলে আপনিও পাবেন। ফিরে আসুন, যারা ভালোবাসে না তাদের কাছে থাকবেন না।'
আপনারা স্টেট গভর্নমেন্টের চাকরি করেন, অযথা কাউকে হেনস্তা করবেন না...’, বিএলও-দের বিশেষ বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর।
আগামী বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে রাজ্যে বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও-দের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে । নির্বাচন কমিশনের তরফে গত সপ্তাহে একাধিক জেলা, কলকাতায় বিএলওদের নিয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ পর্বের আয়োজন হয়েছে। উত্তরবঙ্গেও এই প্রশিক্ষণ শিবির হতে চলেছে। তার আগে যদি রাজ্যের একাধিক কর্তাদের নিয়ে দিল্লিতে এক দফা ট্রেনিং হয়েছে। দিল্লিতে প্রশিক্ষণের এই প্রক্রিয়া তাকে না জানিয়ে হয়েছে বলে দাবি করে শুক্রবার বোলপুর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বিএলওদের উদ্দেশে স্পষ্ট নির্দেশ, ভোটার তালিকায় একজনও ভোটারের নাম যেন বাদ না পড়ে।
সোমবার বোলপুর গীতাঞ্জলি প্রেক্ষাগৃহে প্রশাসনিক বৈঠক করেন তিনি। সেখানেই মমতা বলেন, ডিএমদের একটু চোখকান খোলা রাখতে হবে। অনেক সময়ে দেখেছি ডিএমরা নীচের কাউকে দায়িত্ব দিয়ে দিচ্ছেন। তারা খেয়ালও রাখছেন না। এই যে বাংলা থেকে প্রায় এক হাজার লোককে নিয়ে গিয়েছে, দিল্লিতে ট্রেনিং করানোর জন্য, আমরা জানতামই না। ডিএমদের আমাদের জানানো উচিত ছিলো। আমাকে না বলুক অন্তত মুখ্যসচিবকে জানানো উচিত ছিলো।
এর পরেই তিনি বলেন, বিএলও যে তালিকা করেছেন, আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ থাকবে, ভোটার লিস্ট থেকে কারও নাম যেন বাদ না যায় তা দেখার। মনে রাখবেন, আপনারা স্টেট গভর্নমেন্টের চাকরি করেন, অযথা কাউকে হেনস্তা করবেন না।
চলতি বছরের নভেম্বরে বিহারে বিধানসভা ভোট। তার আগে ভোটার তালিকায় ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (সার) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন করেছে নির্বাচন কমিশন। সে কাজ প্রায় শেষের মুখে। তবে তৃণমূলের দাবি, ‘বিহার বস ঝাঁকি হ্যয়, বেঙ্গল অভি বাকি হ্যয়।’ অর্থাৎ বিহারকে ঢাল করে আসলে বাংলায় ভোটার তালিকায় হাত দিতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। সার-এর মাধ্যমে বাংলার ভোটার তালিকা থেকে বহু নাম বাদ দিয়ে এনআরসির পথে হাঁটাও শুরু করতে চাইছে বলে দাবি এ রাজ্যের শাসকদলের।
অনেকেই বলছেন, আগস্টের প্রথম সপ্তাহেই এ রাজ্যে শুরু হচ্ছে এসআইআর। রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক অফিসও প্রস্তুত বলেই দাবি করেছে। তার মধ্যে মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। যদিও আমলাদের একটা বড় অংশ বলছেন, যে হাজার জনের দিল্লি যাওয়ার কথা বলছেন, তা রাজ্য সরকার জানবে না তা কখনোই হতে পারে না। সব মিলিয়ে বিষয়টি নিয়ে জলঘোলা হতে শুরু করেছে।
এদিন মুখ্যমন্ত্রী বোলপুরের বৈঠক থেকে বলেন, ইলেকশন কমিশন যখন ভোটের নির্ঘণ্টের নোটিফিকেশন জারি করে, তখন থেকে এটা (সরকারি আধিকারিকদের বিষয়) ইলেকশন কমিশনের আওতায় চলে যায়। তার আগে রাজ্য সরকার। আবার ভোটের পরেও রাজ্য সরকার।
প্রসঙ্গত, এই বিএলওরাই ভোটার তালিকার প্রাথমিক সার্ভে করেন। নির্বাচন কমিশনের তালিকা অনুযায়ী, শিক্ষক, অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী, পঞ্চায়েত সচিব, পোস্টম্যান, স্বাস্থ্যকর্মী, চুক্তিভিত্তিক শিক্ষক, বিএলও তালিকায় পড়েন। এবার এসআইআর আবহে তাদের ভূমিকা অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ। আর সেখানে তাদের উদ্দেশে মুখ্যমন্ত্রীর এই বার্তা যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ মনে করা হচ্ছে।
বিজেপি নেতা অমিত মালব্য মমতার এ দিনের বক্তব্য তুলে ধরে বলেন, মমতা এখন সরাসরি থ্রেট করা শুরু করেছেন। তিনি জানেন, ভুয়ো ভোট ছাড়া জেতা সম্ভব নয়।