রাজনৈতিক দলগুলো সাধারণত নির্বাচনে হারলেও টিকে থাকে। কিন্তু তারা যে জিনিসটির মুখোমুখি হয়ে সবচেয়ে বেশি অস্তিত্বের সংকটে পড়ে, তা হলো- হঠাৎ করে ক্ষমতার মসনদ হারানো। ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এখন ঠিক সেই চরম ও নজিরবিহীন সংকটের আবর্তে পড়েছে। নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) কাছে ক্ষমতা হারানোর মাত্র এক মাসের মাথায় দিদি ও তাঁর ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে দলটির ভেতরে শুরু হয়েছে এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ। তৃণমূলের সিংহভাগ বিধায়ক ও সাংসদের এই ‘বিদ্রোহ’ দলটিকে এখন খণ্ডবিখন্ড হওয়ার দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভারতের রাজনীতিতে কোনো সাধারণ আঞ্চলিক নেত্রী নন। ২০১১ সালে এই অগ্নিকন্যা যা করেছিলেন, তা অনেকের কাছেই ছিল অসম্ভব। তিনি পশ্চিমবঙ্গের টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনের অবসান ঘটিয়ে বিশ্বের দীর্ঘতম নির্বাচিত বামপন্থী সরকারের পতন ঘটিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ‘টাইম’ ম্যাগাজিন তাঁকে বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান দেয়। টানা ১৫ বছর শাসন করে তিনি তৃণমূলকে ভারতের অন্যতম সফল আঞ্চলিক দল এবং নিজেকে অন্যতম প্রধান বিরোধী মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আর ঠিক এই কারণেই গত এক মাসে পশ্চিমবঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো পুরো রাজনৈতিক মহলকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

ভোটব্যাংক অক্ষত, তাও তাসের ঘরের মতো ভাঙছে দল
গত মাসে তীব্র প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতা, ধর্মীয় মেরুকরণ এবং ভোটার তালিকা সংক্রান্ত বিতর্কের এক জোরালো সমীকরণে তৃণমূলের ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে নবান্নের দখল নেয় বিজেপি। তবে ব্যালট বাক্সে তৃণমূল কিন্তু একেবারে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি। দলটি এখনও ২ কোটি ৬০ লক্ষ ভোট পেয়েছে, যা বিজেপির চেয়ে মাত্র ৩০ লক্ষ কম। অর্থাৎ, রাজ্যের ৪০ শতাংশ মানুষের ভোট এখনও তৃণমূলের ঝুলিতে রয়েছে। বিধানসভায় ৮০ জন বিধায়ক এবং লোকসভায় ২৮ জন সংসদ সদস্য নিয়ে যে কোনো সাধারণ রাজনৈতিক হিসাব অনুযায়ী দলটির এখন ঘুরে দাঁড়ানোর কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র—দলটি এখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে।
আসল ধাক্কাটি এসেছে বিধানসভার অন্দর থেকে। নির্বাচনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তৃণমূলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ (চার ভাগের তিন ভাগ) বিধায়ক মমতা এবং তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে খোলাখুলি বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। এই বিদ্রোহী বিধায়করা দলের সংসদীয় কমিটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নতুন বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করেছেন এবং মমতা-অভিষেকের বিরুদ্ধে আইনি নথিতে ভুয়া স্বাক্ষর করার গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।

রাজ্য ছাড়িয়ে দিল্লিতেও বিদ্রোহের আগুন
পশ্চিমবঙ্গের এই বিদ্রোহের আগুন এখন পৌঁছে গেছে দেশের রাজধানী দিল্লিতেও। জানা গেছে, তৃণমূলের ২৮ জন লোকসভা সাংসদের মধ্যে ২০ জন ইতিমধ্যেই লোকসভার স্পিকারকে চিঠি দিয়ে দল ছাড়ার এবং বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটে যোগ দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। যদি এই চিঠির সত্যতা আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়, তবে তা আর শুধু অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকবে না, বরং দলটির অস্তিত্বেরই বিলোপ ঘটাবে।
দলের এই পতন কতটা দ্রুত হচ্ছে, তার প্রমাণ মিলছে সাংগঠনিক স্তরেও। ২০২১ সালের নির্বাচনে যে ফালতা কেন্দ্রে তৃণমূল ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে জিতেছিল, সেখানে একটি পুনঃনির্বাচনের জন্য দল কোনো প্রার্থী পর্যন্ত দাঁড় করাতে পারেনি। জুনের শুরুতে আয়োজিত তৃণমূলের একটি জনসভায় মাত্র কয়েক শ মানুষের উপস্থিতি ছিল দলটির জনপ্রিয়তায় ধসের সবচেয়ে বড় প্রতীক। প্রতিদিন দলটির হেভিওয়েট নেতারা দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হচ্ছেন, দলীয় কার্যালয়গুলো জনশূন্য হয়ে পড়েছে এবং যে বাহুবলীরা একসময় এলাকায় বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খাওয়াতেন, তারা নিজেদের এলাকাতেই আক্রান্ত হচ্ছেন।
মতাদর্শহীন কাঠামো এবং পারিবারিক উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্ব
রাজনৈতিক বিজ্ঞানী দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য এই পরিস্থিতিকে ‘অভূতপূর্ব’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, ২০১১ সালে যে কমিউনিস্টদের হারিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায় এসেছিল, তাদের মতো কোনো শক্তিশালী মতাদর্শগত বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৃণমূল কখনো গড়ে তোলেনি। এই দলটির টিকে থাকার মূল ভিত্তি ছিল দুটি, একটি মমতার ক্যারিশমা বা ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’, আর অন্যটি ক্ষমতার সুবাদে পাওয়া ‘সরকারি সম্পদ ও অনুদান’।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দল পরিচালনার জন্য কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার চেয়ে স্থানীয় বাহুবলী ও নেতাদের নিজস্ব এলাকায় ব্যাপক স্বায়ত্তশাসন দিয়ে রেখেছিলেন। ক্ষমতায় থাকা পর্যন্ত এই মডেল দারুণ কাজ করেছে। ক্ষমতার ভাগাভাগি, দুর্নীতি আর আখের গোছানোর সুযোগ থাকায় দলটির কোন্দলও আড়ালে ছিল। কিন্তু এখন ক্ষমতা চলে যাওয়ায় এবং খোদ কলকাতা কেন্দ্র থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত পরাজয়ের পর সেই ‘অপরাজিত দিদি’র ব্র্যান্ড ভ্যালু মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে সিবিআই-ইডি তদন্ত এবং জনগণের ক্ষোভ থেকে বাঁচতে স্থানীয় নেতারা এখন দল ছাড়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
দিল্লির ‘সেন্টার ফর পলিসি রিসার্চ’-এর ফেলো রাহুল ভার্মা মনে করেন, জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপির মতো একটি একক প্রভাবশালী দলের উপস্থিতি আঞ্চলিক নেতাদের দলবদলের সমীকরণ বদলে দিয়েছে। আগে দলবদল হতো ব্যক্তিগত স্বার্থে, আর এখন বিজেপির মতো শক্তিশালী বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র এবং রাজনৈতিক সুরক্ষার ছাতা পেয়ে আস্ত একটা গোষ্ঠী বা উপদল বিদ্রোহ করছে। মহারাষ্ট্রের ‘শিবসেনা’ যেভাবে পারিবারিক উত্তরাধিকারের দ্বন্দ্বে ভেঙে দু টুকরো হয়েছিল, তৃণমূলের অবস্থাও এখন ঠিক সেরকম। আমৃত্যু নেতার কর্তৃত্ব মেনে নিলেও, দলের পুরোনো ও উচ্চাভিলাষী লেফটেন্যান্টরা যখন দেখেন ক্ষমতা কোনো যোগ্য নেতার হাতে না গিয়ে পরিবারের কোনো তরুণ উত্তরাধিকারীর (অভিষেক) পকেটস্থ হচ্ছে, তখনই এই ধরনের গণবিদ্রোহের সূচনা হয়।
লড়াইয়ে অনড় মমতা, ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়
৭১ বছর বয়সী লড়াকু নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য এখনো হাল ছাড়তে রাজি নন। তিনি বিজেপির এই জয়কে অবৈধ এবং অনৈতি আখ্যা দিয়েছেন এবং প্রায় ১০০ আসনে ভোট লুট হয়েছে বলে দাবি করেছেন। এই বিদ্রোহকে তীব্র কটাক্ষ করে তিনি বলেন, এতদিন যারা ক্ষমতার মধু খেয়েছেন, আজ দল হারতেই তারা অন্য দলের সাথে সেটিং করে নিয়েছেন। তবে কর্মীদের ওপর ভরসা রেখে তিনি হুঙ্কার দিয়েছেন, আমরা তৃণমূলকে আবার নতুন করে গড়ে তুলব। তৃণমূল কোনো নেতার দল নয়, এটা সাধারণ কর্মীদের দল।
তৃণমূল কি এই চরম অস্তিত্বের সংকট কাটিয়ে পুনরুজ্জীবিত হতে পারবে? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনই শেষ কথা বলা যাচ্ছে না। এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে আছেন একজন সাবেক কমিউনিস্ট নেতা, যিনি পরবর্তীতে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। ফলে বিদ্রোহীদের এই জোট যেকোনো সময় ভেঙেও যেতে পারে। তবে দিল্লিতে থাকা সাংসদরা যদি সত্যিই দল বদলে অনড় থাকেন, তবে মমতার জন্য ফেরা কঠিন হবে।
তবুও অনেকেই মনে করেন মমতাকে মাঠের বাইরে ছুড়ে ফেলা এত সহজ নয়। দ্বৈপায়ন ভট্টাচার্য বলেন, তিনি এখনো ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। কারণ বাংলায় এখনো যদি এমন কোনো মুখ থাকে যা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এমন কোনো কণ্ঠ থাকে যাকে মানুষ উপেক্ষা করতে পারে না, তা হলেন মমতা। তবে এই প্রত্যাবর্তনের জন্য শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিশমা যথেষ্ট নয়, দলের ভেতর আমূল সংস্কার এবং শীর্ষ নেতৃত্বে ভাইপো-তন্ত্রের মতো কঠিন সিদ্ধান্তগুলো মমতাকে নিতে হবে, যা অতীতে তিনি কখনোই করতে চাননি। সরকার ফেলে দেয়া এক জিনিস, আর নিজের ঘরের লোকেরাই যখন ঘর পোড়াতে উদ্যত হয়, তখন শূন্য থেকে দল গড়া সম্পূর্ণ অন্য জিনিস, মমতা এখন তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন সেই পরীক্ষার মুখেই দাঁড়িয়ে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
