গেঞ্জি ছেড়ে কেন স্যুট পড়ে ট্রাম্পের দরবারে জেলেনস্কি

গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করতে গেঞ্জি (সামরিক পোশাকের মতো) পড়ে গিয়েছিলেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভালোদিমির জেলেনস্কি। বৈঠকের পরে ব্রিফিংয়ের সময় এক সাংবাদিক জেলেনস্কিকে প্রশ্ন করে বসেন, তিনি ফরমাল পোশাক কেন পড়ে নাই। সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের পরই পাশে থাকা ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স কটাক্ষের হাসি হাসেন। পরিস্থিতি এমন হয় যে, নিজে নিজেই অপমানিত হতে থাকেন জেলেনস্কি। এর আগে বৈঠকটিও ছিল মারমার কাটকাট।

কিন্তু এবার সেই ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে জেলেনস্কি হোয়াইট হাউসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে গেছেন একেবারে ফরমাল স্যুট পড়ে। এতে বেশ খুশিসহ তার প্রশংসাও করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। স্যুটে কোনো ডিপ্লোমেসি আছে কিনা তা জানা না গেলেও এতোটুকু বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্পকে রিড করার চেষ্টা করছেন জেলেনস্কি। আর বৈঠকের তথ্য বলছে, অনেক বোঝাপড়ার দিকে এগিয়ে গেছে ইউক্রেন। তবে গতবারের উত্তপ্ত বৈঠকের বিপরীতে এবার উভয় নেতাই সংঘাতপূর্ণ ভাব প্রকাশ এড়িয়েছেন, যদিও তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়ে গেছে।

বৈঠকে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট বারবার ‘ধন্যবাদ’ বলেছেন, যা ট্রাম্পকে খুশি করেছে বলে মনে হচ্ছে। ওভাল অফিসে প্রাথমিক উপস্থিতিতে জেলেনস্কি খুব কম কথা বলেছেন, সম্ভবত ট্রাম্পের প্রত্যাশার বিপরীতে কিছু বলতে তিনি অনিচ্ছুক ছিলেন।

ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির বৈঠক।

পরে ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হলে মতপার্থক্য প্রকাশ পায়। জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁ উভয়েই বলেছেন, ইউক্রেনে যুদ্ধবিরতি পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত, যদিও ট্রাম্প যুক্তি দিয়েছেন যে স্থায়ী সমাধানের আগে যুদ্ধবিরতি প্রয়োজন নয়। জেলেনস্কি এই বিষয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে নীরব ছিলেন।

নেতাদের বক্তব্য থেকে জানা যায়, রুদ্ধদ্বার বৈঠকের পেছনে আলোচনায় ইউক্রেনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং জেলেনস্কি ও পুতিনের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠকের সম্ভাবনার উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চয়তার বিস্তারিত বা পুতিনের সঙ্গে মুখোমুখি বৈঠক কীভাবে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে সাহায্য করবে তা প্রকাশ করা হয়নি। তবে, দিনব্যাপী আলোচনার পর জেলেনস্কি নিরাপত্তা নিশ্চয়তাকে ‘যুদ্ধ শেষ করার জন্য প্রারম্ভিক পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

হোয়াইট হাউসের বাইরে একটি সংবাদ সম্মেলনে জেলেনস্কি বলেছেন, নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মধ্যে কিয়েভ এবং ওয়াশিংটনের মধ্যে ৯০ বিলিয়ন ডলারের (৬৭ বিলিয়ন পাউন্ড) একটি চুক্তি অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, যার মাধ্যমে বিমান ব্যবস্থা, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্য অস্ত্র কেনা হবে। যদিও তিনি অন্য অস্ত্রের বিস্তারিত প্রকাশ করেননি। তিনি আরও বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনীয় ড্রোন কিনবে, যা ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ ড্রোন উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করবে। যদিও কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি হয়নি। তবে জেলেনস্কি বলেছেন, আগামী ১০ দিনের মধ্যে এই বিষয়ে একটি চুক্তি হতে পারে।

আগস্টে জেলেনস্কি-ট্রাম্প বৈঠক।

জেলেনস্কি পুতিনের সঙ্গে সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে বেশি আলোচনা করতে ইচ্ছুক ছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি রুশ প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের জন্য প্রস্তুত এবং মস্কো সম্মত হলে ট্রাম্পও আলোচনায় যোগ দিতে পারেন। তবে পুতিন এখন পর্যন্ত জেলেনস্কির সঙ্গে সরাসরি বৈঠকে রাজি হননি। ‘ইউক্রেন শান্তির পথে কখনও থামবে না’, উল্লেখ করে জেলেনস্কি বলেছেন, যদিও কোনো তারিখ নির্ধারিত হয়নি।

বৈঠকের পর নেতারা সাংবাদিকদের সামনে ইউক্রেনের সম্ভাব্য ভূখণ্ড ছাড়ের বিষয়টি উত্থাপন করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তবে জেলেনস্কি উল্লেখ করেছেন, তিনি ট্রাম্পকে ইউক্রেনের একটি মানচিত্র দেখিয়েছেন। তার দাবি, গত এক হাজার দিনে রাশিয়া ইউক্রেনের এক শতাংশেরও কম ভূমি দখল করেছে। তিনি বলেন, এই তথ্য হোয়াইট হাউসের জন্য নতুন ছিল এবং এটি ট্রাম্পের মেজাজ পরিবর্তনে সাহায্য করেছে। 

জেলেনস্কি তার সর্বশেষ হোয়াইট হাউস সফর নিয়ে বেশিরভাগ সময় আশাবাদী ছিলেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠককে ‘উষ্ণ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তবে তার এই আশাবাদ ইচ্ছাকৃত বলে মনে হয়েছে, কারণ তিনি গত ওভাল অফিস সফরের পুনরাবৃত্তি এড়াতে এবং আমেরিকান হোস্টদের যুদ্ধ শেষ করার বিষয়ে ইউরোপীয় অবস্থান গ্রহণে রাজি করাতে চেয়েছেন।

তবে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল হলো- এটি ইউক্রেনকে আরও সময় নিতে সাহায্য করেছে। ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে ট্রাম্পের প্রথম বৈঠকের পর পুতিনের সঙ্গে তার ফোনালাপ থেকে বোঝা যায়, রাশিয়াও একইভাবে সময় নিতে পেরেছে।

ব্যাপক আশঙ্কা সত্ত্বেও, আলাস্কা এবং ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনে কোনো বিপর্যয় ঘটেনি—অন্তত যা প্রকাশ্যে জানা গেছে তা থেকে। বর্তমান অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে।