থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার মধ্যে বিতর্কিত সীমান্ত বরাবর একাধিক অঞ্চলে পুনরায় লড়াই শুরু হয়েছে। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এনেছে এবং থাইল্যান্ড কম্বোডিয়ার সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করেছে। এই নতুন সংঘাত জুলাই মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির জন্য একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
থাই সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার ভোর হওয়ার আগে পাঁচটি সীমান্ত অবস্থানে সংঘর্ষ শুরু হয়। কম্বোডিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, তাদের বাহিনীর ওপর হামলা হয়েছে, তবে তারা পাল্টা আক্রমণ করেনি এবং থাইল্যান্ডের বহু উস্কানিমূলক কার্যকলাপ সত্ত্বেও যুদ্ধবিরতিকে সম্মান দেখাচ্ছে।
থাই সেনাবাহিনী বলেছে, তাদের সেনারা আক্রান্ত হয়েছে এবং কম্বোডিয়া বেসামরিক এলাকায় ট্রাক-মাউন্টেড রকেট নিক্ষেপ করেছে। তাদের দাবি, কম্বোডিয়ার বাহিনী গ্রেনেড লঞ্চার, আর্টিলারি ব্যবহার করেছে এবং ড্রোন দিয়ে থাই ঘাঁটিতে বোমা ফেলেছে।
থাই বিমান বাহিনী বলেছে, কম্বোডিয়া ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও যুদ্ধ ইউনিট মোতায়েন করেছে দেখে সেটি প্রতিহতে তারা সোমবার ভোরে সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান দিয়ে হামলা চালিয়েছে।
সংঘাতের কারণে থাইল্যান্ডে প্রায় চার লাখ মানুষকে আশ্রয়ের জন্য সরিয়ে নেয়া হচ্ছে এবং কম্বোডিয়ার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওদ্দার মিয়ানচে প্রদেশ থেকে ১,১৫৭টি পরিবারকে অন্যত্র সরানো হচ্ছে।
সীমান্ত সংঘাতের কারণ কি?
নতুন সংঘাতের ফলে জুলাইয়ের পর সবচেয়ে মারাত্মক লড়াই শুরু হলো। জুলাইয়ের পাঁচ দিনের সংঘাতে ৪৮ জন নিহত এবং তিন লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। ট্রাম্পের হস্তক্ষেপে সেই সময়ে যুদ্ধবিরতি হয়েছিল।
তবে এই নতুন অশান্তির সূত্রপাত কী থেকে হলো তা এখনো স্পষ্ট নয়, তবে ১০ নভেম্বর একটি ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে এক থাই সেনা আহত হবার পর থেকে উত্তেজনা বাড়ছিলো। এর প্রতিক্রিয়ায় থাইল্যান্ড কয়েক সপ্তাহ আগে মালয়েশিয়ায় ট্রাম্পের উপস্থিতিতে সম্মত যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্থগিত করে দেয়।
থাইল্যান্ড অভিযোগ করেছে, কম্বোডিয়া নতুন করে বেশ কয়েকটি ল্যান্ডমাইন পুঁতেছে এবং কম্বোডিয়া ক্ষমা না চাওয়া পর্যন্ত তারা উত্তেজনা কমাতে কনো পদক্ষেপ নেবে না। কম্বোডিয়া অবশ্য বারবার এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। নমপেন জানিয়েছে, ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। হামলা করেছে থাইল্যান্ড।
এ বছরের শুরুতে থাইল্যান্ডে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়। মে মাসে এক সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষে কম্বোডিয়ার এক সনা নিহত হবার পর সীমান্তে সেনা সংখ্যা বাড়ানো হয়। আগস্টে, প্রভাবশালী সাবেক কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের সাথে থাই প্রধানমন্ত্রী পেতোংতার্ন সিনাওয়াত্রার একটি সংবেদনশীল ফোনালাপ ফাঁস হয়ে যাওয়ার পর জনরোষের জেরে আদালত তাকে পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
বিবাদের উৎপত্তি কোথায়?
দুই দেশের মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত শত বছরের পুরনো এবং তাদের ৮১৭ কিলোমিটার (৫০৮ মাইল) স্থল সীমান্তের বিভিন্ন অচিহ্নিত অংশ রয়েছে। ১৯০৭ সালে ফ্রান্স যখন কম্বোডিয়ার উপনিবেশ ছিল, তখন তারা প্রথম এই সীমান্ত মানচিত্র তৈরি করে। এই মানচিত্রটি সীমান্তের জলবিভাজিকা রেখা বরাবর নির্ধারণের একটি চুক্তির ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছিল, যা থাইল্যান্ড পরে অস্বীকার করে।
২০০৩ সালে কম্বোডিয়ার ঐতিহ্যবাহী আংকর ওয়াট মন্দিরের আইনি এখতিয়ার নিয়ে এক থাই সেলিব্রিটির কথিত মন্তব্যের জেরে দাঙ্গাকারীরা নমপেনে থাই দূতাবাস এবং থাই ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে আগুন ধরিয়ে দেয়।
একাদশ শতাব্দীর হিন্দু মন্দির প্রেয়া ভিহার বিবাদের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ১৯৬২ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত এই মন্দিরটি কম্বোডিয়াকে দিয়ে দেয়, তবে থাইল্যান্ড পাশের জমির ওপর দাবি ধরে রাখে। ২০০৮ সালে কম্বোডিয়া যখন প্রেয়া ভিহারকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করার চেষ্টা করে তখন উত্তেজনা বাড়ে, যা ২০১১ সালে এক সপ্তাহব্যাপী গোলাগুলির মাধ্যমে চরম আকার ধারণ করে।