হতভম্ব ভেনিজুয়েলানদের প্রশ্ন, এরপর কী

শনিবার ভোরের দিকে ভেনিজুয়েলার রাজধানী কারাকাসের রাস্তাগুলো ছিল প্রায় জনশূন্য। ভেনিজুয়েলার নিরাপত্তা বাহিনী তখন টহল দিচ্ছিল। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বিকট বিস্ফোরণের শব্দে শহরবাসীর ঘুম ভেঙেছিল এবং তারা জানতে পেরেছিল যে, মার্কিন কমান্ডোরা দেশে বোমা হামলা চালিয়েছে এবং প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে বন্দি করে ধরে নিয়ে গেছে। মাদুরোর অবস্থান এখনও অজানা।

প্রেসিডেন্ট প্যালেস মিরাফ্লোরেসের আশেপাশের রাস্তাগুলো ছিল সম্পূর্ণ জনমানবহীন, শুধু ইউনিফর্ম পরা সশস্ত্র প্রহরীদের চেকপোস্টগুলো সেখানে দৃশ্যমান ছিল। তেলসমৃদ্ধ দেশটির বর্তমান নিয়ন্ত্রক কে- তা নিয়ে জনমানুষের মধ্যে যেমন ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, তেমনি মার্কিন সামরিক হামলায় তারা স্তব্ধ হয়ে পড়েছে।

আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছিল; উত্তরে 'লা গুয়াইরা' বন্দরের দিক থেকে কালো ধোঁয়ার কুণ্ডলী তখনো আকাশে কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছিল, আর রাজধানীর একটি বিমান ঘাঁটির কাছেও একই দৃশ্য দেখা গেছে। বেশিরভাগ মানুষই বাড়িতে অবস্থান করে ফোনের পর্দায় সর্বশেষ খবরের দিকে নজর রাখছিলেন। অন্যদিকে, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থার আশঙ্কায় কেউ কেউ নিত্যপণ্য মজুদ করতে বাজারে বেরিয়েছিলেন।

নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মারিয়া করিনা মাচাদোর নেতৃত্বাধীন বিরোধী শিবিরের সমর্থকদের মধ্যে এক ধরণের উত্তেজনা ও উদ্দীপনা লক্ষ্য করা গেছে। তেল সমৃদ্ধ মারাকাইবো শহরের ৩৯ বছর বয়সী মেকানিক জাইরো চাসিন মুদি দোকানের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে থাকা আমার বোন কান্নাকাটি করে ফোন দিয়ে আমাকে এই খবরটি জানায়। আমরা খুশিতে দুজনেই কেঁদেছি।

তিনি আরও বলেন, লুটপাটের ভয়ে আমি আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দেখতে বেরিয়েছিলাম, কিন্তু রাস্তা একদম ফাঁকা। গাড়ির ট্যাঙ্কি পূর্ণ করতে চেয়েছিলাম কিন্তু পেট্রোল পাম্পগুলো ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। তাই কিছু খাবার কিনে রাখছি কারণ সামনে কী হবে জানি না। সত্যি বলতে, আমার মনের ভেতর এখন ভয় আর আনন্দ- দুটোই কাজ করছে।

মাদক পাচার এবং অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকার অভিযোগে কয়েক মাসের ক্রমাগত চাপের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মাদুরোকে বন্দি করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। ১৯৮৯ সালে পানামায় সামরিক নেতা ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর লাতিন আমেরিকায় এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ।

মাদুরো বন্দি হওয়ার কিছু সময় পর দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়ো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে হেলমেট ও ফ্ল্যাক জ্যাকেট পরে উপস্থিত হন এবং ভেনিজুয়েলানদের প্রতি আহ্বান জানান যেন তারা "সন্ত্রাসী শত্রুদের" (যুক্তরাষ্ট্র) সাথে সহযোগিতা না করে। তবে ভেনিজুয়েলার বিরোধী দল এক্সে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, এই ঘটনার বিষয়ে তাদের কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য নেই।

রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, রাত প্রায় ২টার দিকে হামলা শুরু হয়। প্রায় ৯০ মিনিট ধরে কারাকাস জুড়ে বিস্ফোরণ, যুদ্ধবিমান এবং কালো ধোঁয়া দেখা গেছে। রয়টার্স দ্বারা যাচাইকৃত ভিডিওতে রাতের আকাশে একাধিক বিস্ফোরণ এবং এর পরপরই প্রচণ্ড শব্দ হতে দেখা গেছে। এই হামলার ফলে একটি বড় সামরিক ঘাঁটির কাছে শহরের দক্ষিণ অংশ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে।

ভেনিজুয়েলার কেন্দ্রীয় শহর ভ্যালেন্সিয়ার বাসিন্দা ৭৪ বছর বয়সী ন্যান্সি পেরেজ বাড়ির পাশের একটি বেকারিতে দাঁড়িয়ে বলেন, আমি বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। প্রথমে সোশ্যাল মিডিয়ায় এবং পরে টেলিভিশনে দেখলাম। এখন শুধু জানতে চাই এর পরে কী ঘটতে যাচ্ছে।

লা গুয়াইরা বন্দরের ওপর আগুন ও ধোঁয়া ওড়ার একটি ভিডিও রয়টার্স সত্যতা যাচাই করে নিশ্চিত করেছে। এছাড়া পূর্ব কারাকাসের জেনারেলিসিমো ফ্রান্সিসকো দে মিরান্ডা বিমান ঘাঁটিতেও বিস্ফোরণ ও ধোঁয়ার ভিডিওর সত্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে। শনিবার সকালে ফ্লাইট রাডার ট্র্যাকারগুলোতে দেখা গেছে, ভেনিজুয়েলার আকাশসীমা সম্পূর্ণ ফাঁকা।

রাজধানীর পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী ৫০ বছর বয়সী কারমেন মার্কেজ জানান, তিনি তার বাড়ির ছাদে উঠে বিভিন্ন উচ্চতায় বিমানের শব্দ শুনতে পেয়েছেন, যদিও অন্ধকারে সেগুলো দেখা যাচ্ছিল না। তিনি বলেন, আগুনের ফুলকির মতো কিছু একটা আকাশ দিয়ে যাচ্ছিল আর এরপরই বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। আমরা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। সরকারের পক্ষ থেকে আমরা কিছুই জানি না, শুধু রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন যা বলছে সেটুকুই।