ভেনেজুয়েলার তেল নিয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই সপ্তাহের শেষের দিকে যুক্তরাষ্ট্রের তেল কোম্পানিগুলোর নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা করছেন। ওই বৈঠকে ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হবে।
মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) একটি সূত্রের বরাত দিয়ে এই খবর জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
সূত্র জানিয়েছে, এই বৈঠকগুলো প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, যাতে শীর্ষ মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশে ফিরে আসতে পারে। এর প্রায় দুই দশক আগে দেশটির সরকার মার্কিন নেতৃত্বাধীন জ্বালানি কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিলো।
দেশের তিনটি বৃহত্তম তেল কোম্পানি- এক্সন মবিল, কনোকোফিলিপস এবং শেভরন মাদুরোর অপসারণ নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এখনও কোনো কথাবার্তা হয়নি বলে জানিয়েছেন এ বিষয়ে পরিচিত চারজন তেল শিল্প নির্বাহী। এটি সাপ্তাহান্তে ট্রাম্পের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেছিলেন যে, মাদুরোকে গ্রেপ্তারের আগে এবং পরে তিনি ‘সব’ মার্কিন তেল কোম্পানির সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
এদিকে সোমবার সূত্র জানিয়েছে, মাদুরোকে অপসারণের আগে বা পরে এই তিন কোম্পানির কেউই হোয়াইট হাউসের সঙ্গে ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম নিয়ে কথা বলেনি।
আসন্ন বৈঠকগুলো ওপেক সদস্য ভেনেজুয়েলা থেকে অশোধিত তেলের উৎপাদন ও রপ্তানি বাড়ানোর প্রশাসনের আশার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কাছে বিশ্বের সর্ববৃহৎ তেল মজুত রয়েছে এবং এর তেল বিশেষভাবে ডিজাইন করা মার্কিন রিফাইনারিগুলোতে পরিশোধন করা যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এই লক্ষ্য অর্জনে বছরের পর বছর কাজ এবং বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ লাগবে।
কোন নির্বাহীরা আসন্ন বৈঠকে যোগ দেবেন এবং তেল কোম্পানিগুলো আলাদাভাবে না সম্মিলিতভাবে যোগ দেবে তা স্পষ্ট নয়।
হোয়াইট হাউস বৈঠক নিয়ে মন্তব্য করেনি, তবে বলেছে যে তারা বিশ্বাস করে মার্কিন তেল শিল্প ভেনেজুয়েলায় প্রবেশের জন্য প্রস্তুত।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র টেলর রজার্স বলেছেন, আমাদের সব তেল কোম্পানি ভেনেজুয়েলায় বড়ো বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত ও ইচ্ছুক।
রয়টার্স এক্সন, শেভরন এবং কনোকোফিলিপস মন্তব্যের অনুরোধ করলে তারা তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
এদিকে ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার জ্বালানি অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে সক্ষম করতে ভর্তুকি দিতে পারে।
সামরিক অভিযানের আগে কোনো তেল কোম্পানিকে প্রশাসন ব্রিফ করেছে কিনা জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, না করা হয়নি। তবে তিনি বলেন, কিন্তু ‘যদি আমরা এটা করি তাহলে কী হবে?’
এনবিসি নিউজকে ট্রাম্প বলেন, তেল কোম্পানিগুলো জানতো যে আমরা কিছু একটা করার চিন্তা করছি। কিন্তু আমরা তাদের বলিনি যে আমরা এটা করবো।
এদিকে সিবিএস নিউজ একটি অজ্ঞাত সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, তিন কোম্পানির নির্বাহীরা বৃহস্পতিবার জ্বালানি সচিব ক্রিস রাইটের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
একজন তেল শিল্প নির্বাহী রয়টার্সকে বলেছেন, কোম্পানিগুলো হোয়াইট হাউসের সঙ্গে গ্রুপ সেটিংয়ে ভেনেজুয়েলার সম্ভাব্য কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করতে অনিচ্ছুক হবে। অ্যান্টিট্রাস্ট উদ্বেগের কারণে প্রতিযোগীদের মধ্যে বিনিয়োগ পরিকল্পনা, সময় এবং উৎপাদন স্তর নিয়ে সম্মিলিত আলোচনা সীমিত।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী ভেনেজুয়েলার রাজধানীতে বিদ্যুৎ গতিতে অভিযান চালিয়ে মাদুরোকে রাতের অন্ধকারে গ্রেপ্তার করে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়, যেখানে তিনি মাদক সন্ত্রাসবাদের অভিযোগের মুখোমুখি হবেন।
মাদুরোর গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা পর ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করেন বৃহত্তম মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো ভেনেজুয়েলার তেল উৎপাদন বাড়াতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করবে। গত দুই দশকে অবিনিয়োগ এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে উৎপাদন তার শীর্ষের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
কিন্তু অবকাঠামোর অভাব এবং দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আইনি কাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি মার্কিন নীতির গভীর অনিশ্চয়তা এই পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করবে বলে জানিয়েছেন শিল্প বিশ্লেষকরা।
শেভরন বর্তমানে ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে কার্যরত একমাত্র আমেরিকান বড়ো কোম্পানি। অন্যদিকে, এক্সন এবং কনোকোফিলিপসের দেশে গৌরবময় ইতিহাস ছিলো, যতোক্ষণ না সাবেক প্রেসিডেন্ট উগো শাভেজ তাদের প্রকল্প জাতীয়করণ করেন।
নাম না প্রকাশ করার শর্তে এক তেল শিল্প নির্বাহী বলেন, আমি মনে করি না শেভরন ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি যারা ইতিমধ্যে সেখানে আছে এই সম্পদ উন্নয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হবে।
কনোকো শাভেজের অধীনে ভেনেজুয়েলায় তিনটি তেল প্রকল্পের দখল নেওয়ার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ চেয়ে আসছে। এক্সন ২০০৭ সালে দেশ ছেড়ে যাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে দীর্ঘ আরবিট্রেশন মামলায় জড়িত ছিলো।
শেভরন, যারা প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ ব্যারেল অশোধিত তেল ভেনেজুয়েলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গাল্ফ কোস্টে রপ্তানি করে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সতর্কতার সঙ্গে চলাফেরা করে দেশে তাদের উপস্থিতি বজায় রেখেছে।
তবে বিনিয়োগকারীরা আশাবাদী। তারা বাজি ধরছেন যে, ভেনেজুয়েলার নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের পদক্ষেপ মার্কিন কোম্পানিগুলোকে তেল মজুতের প্রবেশাধিকার দেবে। ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে।
এসঅ্যান্ডপি ৫০০ এনার্জি ইনডেক্স ২০২৫ সালের মার্চের পর সর্বোচ্চে উঠেছে। বড়ো কোম্পানিগুলোর মধ্যে এক্সন মবিল ২.২ শতাংশ এবং শেভরন ৫.১ শতাংশ বেড়েছে।