ইরানি বিক্ষোভকারীদের ট্রাম্পের জোরালো বার্তা- ‘সাহায্য আসছে’

ইরানে গত কয়েক বছরের মধ্যে সব থেকে বড় গণবিক্ষোভ দমনে দেশটির ধর্মীয় শাসকগোষ্ঠী যখন কঠোর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার ইরানিদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্যাতনকারীদের নাম মনে রাখার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেছেন, ‘সাহায্য আসছে’। অন্যদিকে ইরান ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় উসকানি এবং সহিংসতা ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছে।

নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যালে এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, দেশপ্রেমিক ইরানিরা, বিক্ষোভ চালিয়ে যান- আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিন!!!... সাহায্য আসছে। তবে, সেই সাহায্য কী ধরনের হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।

তিনি জানান, বিক্ষোভকারীদের ‘বিবেচনাহীন হত্যাকাণ্ড’ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তিনি ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক বাতিল করেছেন। পরবর্তী এক বক্তৃতায় তিনি ইরানিদের উদ্দেশে বলেন, হত্যাকারী এবং নির্যাতনকারীদের নাম সংরক্ষণ করুন... কারণ তাদের খুব বড় মূল্য চোকাতে হবে।

ইরানের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দেশটিতে চলমান বিক্ষোভে প্রায় ২,০০০ মানুষ নিহত হয়েছেন। দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই অস্থিরতায় সরকারিভাবে এই প্রথম নিহতের মোট সংখ্যা জানানো হলো।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা- এইচআরএএনএ জানিয়েছে, তারা ২,০০৩ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছে, যার মধ্যে ১,৮৫০ জনই বিক্ষোভকারী। সংস্থাটি আরও জানায়, এ পর্যন্ত ১৬,৭৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে, যা সোমবারের দেওয়া তথ্যের তুলনায় অনেক বেশি।

‘সাহায্য আসছে’- বলতে তিনি কী বুঝিয়েছেন, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এটি তাদেরই বুঝে নিতে হবে। বিক্ষোভ দমনের দায়ে ইরানকে শাস্তি দিতে ট্রাম্প যেসব বিকল্প নিয়ে ভাবছেন, তার মধ্যে সামরিক পদক্ষেপও রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

ডেট্রয়েট থেকে ওয়াশিংটনে ফেরার পর ট্রাম্প বলেন, হত্যাকাণ্ডের সংখ্যাটি বেশ বড় বলেই মনে হচ্ছে, তবে আমরা এখনো নিশ্চিত নই। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে একটি প্রতিবেদন পাওয়ার পর তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পারবেন বলে জানান। তিনি আরও যোগ করেন, আমরা সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

মঙ্গলবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর আমেরিকান নাগরিকদের অবিলম্বে ইরান ত্যাগের আহ্বান জানিয়েছে। প্রয়োজনে তুরস্ক বা আর্মেনিয়া হয়ে স্থলপথে দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের দিকে আঙুল ইরানের

ইরানি কর্তৃপক্ষ এর আগেও এই অস্থিরতা উসকে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে দায়ী করেছে। ট্রাম্পের ‘সাহায্য আসছে’ পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাঈদ ইরাভানি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন, যা দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং সরকারের স্থিতিশীলতা নষ্ট করার একটি প্রচেষ্টা।

মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে লেখা এক চিঠিতে তিনি বলেন, নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক, বিশেষ করে তরুণদের প্রাণহানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলি সরকার সরাসরি এবং অনস্বীকার্য আইনি দায়বদ্ধতা বহন করে।

রাশিয়া মঙ্গলবার ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বাইরে থেকে নাশকতামূলক হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে। মস্কো বলেছে, গত বছরের মতো মার্কিন হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য বিপর্যয়কর পরিণতি বয়ে আনবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোমবার জানান, তিনি মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন এবং ওয়াশিংটনের প্রস্তাবিত ধারণাগুলো তেহরান খতিয়ে দেখছে।

ফাঁসির বিরুদ্ধে ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প অঙ্গীকার করেন, ইরান যদি বিক্ষোভকারীদের ফাঁসি দেয়া শুরু করে, তবে তিনি খুব কঠোর ব্যবস্থা নেবেন। তবে এক্ষেত্রেও তিনি বিস্তারিত কিছু বলেননি। ট্রাম্প বলেন, যদি তারা তাদের ফাঁসি দেয়, তবে আপনারা অনেক কিছু ঘটতে দেখবেন।

নরওয়েভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস সোসাইটির মতে, ইরানের কারাগারগুলোতে ফাঁসি কার্যকর করার ঘটনা অতি সাধারণ।

ইরানি কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা 'হেঙ্গাও' রিপোর্ট করেছে যে, কারাজ শহরে বিক্ষোভের দায়ে গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ বছর বয়সী এরফান সুলতানিকে বুধবার মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে। পরিবারের ঘনিষ্ঠ সূত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, কর্তৃপক্ষ পরিবারকে জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ডের এই রায় চূড়ান্ত।

রয়টার্স এই সংবাদের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও এখন পর্যন্ত কোনো মৃত্যুদণ্ডের খবর প্রকাশ করা হয়নি।

ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটসহ যোগাযোগের ওপর নানা বিধিনিষেধের কারণে ইরান থেকে তথ্যের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, ফোন পরিষেবা চালু হলেও ইন্টারনেট এখনো সীমাবদ্ধতার মুখে রয়েছে।

‘হোলিস্টিক রেজিলিয়েন্স’ নামক একটি মার্কিন সংস্থা মঙ্গলবার জানিয়েছে, ধনকুবের ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পরিষেবা 'স্টারলিঙ্ক' এখন ইরানে বিনামূল্যে পাওয়া যাচ্ছে।

চরম অর্থনৈতিক দুর্দশা থেকে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ গত তিন বছরের মধ্যে ইরানের শাসকদের জন্য সবচেয়ে বড় অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বছর ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর আন্তর্জাতিক চাপের মুখে থাকা ইরানের জন্য এটি একটি নতুন সংকট।

ট্রাম্প সোমবার ঘোষণা করেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যে কোনো দেশের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। ইরানের তেলের বড় ক্রেতা চীন দ্রুত এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছে।

ভাঙনের কোনো লক্ষণ নেই তেহরান প্রশাসনে

গত ২৮ ডিসেম্বর মুদ্রার মান কমে যাওয়ার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন বর্তমান ধর্মীয় শাসন ব্যবস্থা পতনের আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্বিমুখী অবস্থান নিয়েছে। একদিকে তারা দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক সমস্যা নিয়ে প্রতিবাদ করাকে বৈধ বলছে। তবে ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা এই শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করার মতো নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ স্তরে এখন পর্যন্ত কোনো বড় ফাটল দেখা যায়নি।

বিক্ষোভ দমনের প্রতিবাদে ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইতালি ইরানের রাষ্ট্রদূতদের তলব করেছে। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিন এক্সে এক পোস্টে লিখেছেন, ইরানে হতাহতের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ভয়াবহ।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি ইরানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রাইডরিখ মার্জ বিশ্বাস করেন, বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে। তিনি বলেন, আমি মনে করি আমরা এখন এই শাসনের শেষ দিন বা সপ্তাহগুলো প্রত্যক্ষ করছি। তিনি আরও যোগ করেন, যদি সরকারকে সহিংসতা চালিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখতে হয়, তবে তার অর্থ হলো এর কার্যকর সমাপ্তি ঘটেছে।