ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বর্তমান ধর্মীয় নেতৃত্ব গত কয়েক দশকের মধ্যে সব থেকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে উত্তাল গণবিক্ষোভ, অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকি- সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করার সাম্প্রতিক সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধংদেহী’ মনোভাব দেখালেও, বাস্তব পরিস্থিতি বলছে ভিন্ন কথা।
সামরিক প্রস্তুতির অভাব ও কৌশলগত সীমাবদ্ধতা
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হুমকি সত্ত্বেও পেন্টাগন এখন পর্যন্ত এই অঞ্চলে কোনো বিমানবাহী রণতরি মোতায়েন করেনি। গত অক্টোবর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার কোনো রণতরি নেই; 'ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড' বর্তমানে ক্যারিবীয় সাগরে এবং 'ইউএসএস নিমিৎজ' আমেরিকার পশ্চিম উপকূলে অবস্থান করছে।
এর ফলে, ইরানের ওপর যেকোনো বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাতে হলে ওয়াশিংটনকে সম্পূর্ণভাবে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত বা সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক মিত্রদের ওপর নির্ভর করতে হবে।
কিন্তু গত বছর ইসরাইলের সাথে ১২ দিনের যুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়াবহতা দেখেছে উপসাগরীয় দেশগুলো। তাই নিজ দেশে ইরানি পাল্টা হামলার ঝুঁকি নিয়ে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেবে কি না, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি ও ভৌগোলিক সুবিধা
ইসরাইলের সাথে যুদ্ধে ইরানের সামরিক সক্ষমতা কিছুটা হ্রাস পেলেও ক্ষেপণাস্ত্রের দিক থেকে তেহরান এখনো শক্তিশালী। দ্য গার্ডিয়ানের তথ্যমতে, ইরানের কাছে প্রায় দুই হাজার ভারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যা পাহাড়ি অঞ্চলের গভীরে সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা হয়েছে।
ইরান এই ঘাঁটিগুলোর পুনর্নির্মাণ শেষ করেছে। তেহরান একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করলে, আমেরিকা বা ইসরাইলের অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও তা পুরোপুরি রুখতে হিমশিম খাবে।
নিশানা শনাক্তকরণ ও নাগরিক সুরক্ষা
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্ভুল লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করা। ইরানের সামরিক ও অসামরিক স্থাপনাগুলো শনাক্ত করা সহজ হলেও, বর্তমান বিক্ষোভের সময়ে অনেক স্পর্শকাতর এলাকায় সাধারণ নাগরিকদের উপস্থিতি রয়েছে। ফলে যে কোনো বড় ধরনের বিমান হামলায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, যা হিতে বিপরীত হতে পারে।
রাজনৈতিক ঝুঁকি ও খামেনি সরকারের অবস্থান
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, ১৯৫৩ সালের মার্কিন অভ্যুত্থানের তিক্ত ইতিহাস ইরানিদের মনে আজও তাজা। খামেনি সরকার এই মুহূর্তে জনবিচ্ছিন্ন মনে হলেও, তারা মোটেও দুর্বল নয়। গত বছরের জুন মাসে ইসরাইলের ধারাবাহিক হামলা মোকাবিলা করে তারা টিকে থাকার সক্ষমতা দেখিয়েছে।
যে কোনো বিদেশি হামলাকে সরকার ‘বাহ্যিক হুমকি’ হিসেবে প্রচার করে সাধারণ মানুষের জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে পারে, যা প্রকারান্তরে বিক্ষোভকে অবৈধ প্রমাণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
নেতৃত্বের পরিবর্তন কি সম্ভব?
যুক্তরাষ্ট্র যদি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিইকে লক্ষ্যবস্তু করার কথা বিবেচনা করে, তবে তা আন্তর্জাতিক আইনে জটিলতা তৈরি করবে। এছাড়া, খামেনেই ইতিমধ্যে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করার জন্য তিন জন জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতার একটি তালিকা তৈরি করে রেখেছেন। ফলে খামেনিকে সরিয়ে দিলেও দেশটির শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
ট্রাম্পের হাঁকডাক সত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তি বর্তমানে সীমিত। অন্যদিকে, ইরান তার ভূ-কৌশলগত অবস্থান ও ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি নিয়ে পাল্টা আঘাতের জন্য প্রস্তুত।
এমতাবস্থায়, একটি হঠকারী সামরিক পদক্ষেপ কেবল মধ্যপ্রাচ্যকেই অস্থিতিশীল করবে না, বরং ইরানের ধর্মীয় শাসনকে দীর্ঘস্থায়ী করার ঢাল হিসেবেও কাজ করতে পারে।