২০২১ সালে আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর থেকে তালেবান নিজেদের একতাবদ্ধ হিসেবে দাবি করে আসলেও, সম্প্রতি ফাঁস হওয়া এক অডিও ক্লিপ এবং বিবিসির দীর্ঘ অনুসন্ধানে গোষ্ঠীটির ভেতরে চরম বিভক্তির চিত্র ফুটে উঠেছে। খোদ সুপ্রিম লিডার হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা সতর্ক করে বলেছেন, এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল তালেবান শাসনের পতন ঘটাতে পারে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে কান্দাহারের একটি মাদ্রাসায় দেওয়া আখুন্দজাদার একটি বক্তৃতার অডিও ক্লিপে তাকে বলতে শোনা যায়, এই বিভক্তির ফলে ইসলামি আমিরাত ভেঙে পড়বে এবং শেষ হয়ে যাবে। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই ফাটল নিয়ে বিবিসির আফগান সার্ভিস বর্তমান ও প্রাক্তন তালেবান সদস্য, বিশেষজ্ঞ এবং কূটনীতিবিদদের সাথে একশ জনেরও বেশি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে নিশ্চিত হয়েছে, তালেবানের শীর্ষ পর্যায়ে এখন দুটি স্পষ্ট ও বিপরীতমুখী গোষ্ঠী সক্রিয়।
বিবিসির বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত হয়েছে তালেবানের শীর্ষ পর্যায়ে এখন দুটি ভিন্ন আদর্শিক গোষ্ঠী কাজ করছে।
- কান্দাহার গোষ্ঠী (কট্টরপন্থী): এটি সরাসরি সুপ্রিম লিডার হিবাতুল্লাহ আখুন্দজাদার অনুগত। তাদের লক্ষ্য আফগানিস্তানকে আধুনিক বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা এবং ধর্মীয় নেতাদের মাধ্যমে কঠোর ইসলামি শাসন কায়েম করা। এই গোষ্ঠী নারী শিক্ষার ঘোর বিরোধী।
- কাবুল গোষ্ঠী (বাস্তববাদী): কাবুলে অবস্থানরত প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং কমান্ডারদের এই গ্রুপটি কিছুটা মধ্যপন্থী বা বাস্তববাদী হিসেবে পরিচিত। তারা বহির্বিশ্বের সাথে সম্পর্ক রাখা, দেশের অর্থনীতি পুনর্গঠন এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে।
ইন্টারনেট বন্ধে বিদ্রোহের সূচনা
এতদিন আখুন্দজাদাকে তালেবানের অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা হিসেবে মনে করা হলেও, গত সেপ্টেম্বরে তাঁর একটি আদেশ ঘিরে এই দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। আখুন্দজাদা সারা দেশে ইন্টারনেট ও ফোন সংযোগ বন্ধের নির্দেশ দেন। কিন্তু তার তিন দিন পরেই রহস্যজনকভাবে ইন্টারনেট সচল হয়।
ভেতরের খবর অনুযায়ী, এটি ছিল একটি সরাসরি বিদ্রোহ। মোল্লা বারাদার, সিরাজুদ্দিন হাক্কানি এবং ইয়াকুব মুজাহিদের মতো প্রভাবশালী নেতারা প্রধানমন্ত্রী হাসান আখুন্দকে বুঝিয়ে ইন্টারনেট পুনরায় চালু করেন। তারা সরাসরি কান্দাহারের কর্মকর্তাদের বলেন, সুপ্রিম লিডারের ভুল সিদ্ধান্তে সায় দেয়া বন্ধ করতে হবে।
পর্দার আড়ালে রহস্যময় নেতা
আখুন্দজাদা বর্তমানে কান্দাহার থেকে তাঁর ক্ষমতা পরিচালনা করছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, তিনি খুবই কম কথা বলেন এবং তাঁর ছবি তোলা বা ভিডিও করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। অধিকাংশ মন্ত্রীকে তাঁর সাথে দেখা করার জন্য সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করতে হয়। অন্যদিকে, তিনি ধীরে ধীরে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিভাগগুলো কান্দাহারে সরিয়ে নিচ্ছেন এবং তাঁর অনুগতদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাচ্ছেন।
কাবুল গ্রুপের নেতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন সিরাজুদ্দিন হাক্কানি। এক সময় এফবিআই-এর মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় থাকা এই নেতা এখন জনসমক্ষে নিজের মুখ উন্মোচন করে নিজেকে একজন ‘স্টেটম্যান’ বা কূটনীতিক হিসেবে তুলে ধরছেন। এমনকি তাঁর ওপর থেকে ১০ মিলিয়ন ডলারের পুরস্কারের ঘোষণাও তুলে নেওয়া হয়েছে। ইয়াকুব মুজাহিদ এবং বারাদারও মনে করেন, ইন্টারনেট ও আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ছাড়া আধুনিক রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়।
পরিবর্তনের বছর ২০২৬?
তালেবানের সরকারি মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ অবশ্য কোনো বিভক্তির কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁর মতে, এটি কেবল পারিবারিক মতপার্থক্য। তবে উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী নেদা মোহাম্মদ নাদেমের সাম্প্রতিক বক্তব্যে ভিন্ন সুর পাওয়া গেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, নেতা কেবল একজনই হবেন এবং বাকিরা আদেশ পালন করবেন; অন্যথায় সরকার ধ্বংস হয়ে যাবে।
আখুন্দজাদার প্রতি প্রশ্নাতীত আনুগত্যের যে আদর্শে তালেবান গঠিত হয়েছিল, তা এখন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। ২০২৬ সালে কি এই ‘কাবুল গ্রুপ’ আফগান নারীদের শিক্ষা ও অধিকারের বিষয়ে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে, নাকি কান্দাহারের কট্টরপন্থা জয়ী হবে- তা এখন দেখার বিষয়।