ইরানের ওপর সামরিক অভিযানের অভিপ্রায় মধ্যপ্রাচ্যে এরিমধ্যে নোঙর ফেলেছে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বহুল আলোচিত ‘আর্মাডা’ বা নৌবহর। বসে নেই ইরানও। পর্যবেক্ষকদের মতে, মার্কিন রণতরি ‘আব্রাহাম লিংকন' এই অঞ্চলে তাদের গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সরঞ্জাম মোতায়েন করার পর ইরান সরকার এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নতুন কোনো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, বিক্ষোভ দমনে বর্বরতা ও হাজার হাজার ইরানিকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে এক বিশাল বিমান হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে।
বেশ কয়েকটি গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ারসহ মার্কিন নৌবহরটি এখনও চূড়ান্ত অবস্থানে না পৌঁছালেও ইতিমধ্যেই ইরানের ওপর আঘাত হানার সীমানার মধ্যে চলে এসেছে।
তবে মার্কিন হামলায় পুনরায় রাজপথে বিক্ষোভ শুরু হবে কি না তা নিশ্চিত নয়; কারণ ১৯৭৯ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরোধী অনেক ইরানি নাগরিকও বাইরের শক্তির চাপিয়ে দেওয়া কোনো শাসন পরিবর্তনের ঘোর বিরোধী। তারা বাইরের হস্তক্ষেপের ঘোর বিরোধী।
কূটনৈতিক কোনো অগ্রগতির লক্ষণ না থাকায় সোমবার ইরানের শেয়ার বাজারে বড় ধরনের ধস নেমেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলো ঘোষণা করেছে যে, তারা তাদের আকাশসীমা বা জলসীমা ইরানের বিরুদ্ধে হামলার জন্য ব্যবহার করতে দেবে না।
তবে মার্কিন স্ট্রাইক গ্রুপটি ভূমধ্যসাগরে অবস্থান করায় অনেক ক্ষেত্রে তৃতীয় কোনো পক্ষের অনুমতির প্রয়োজন পড়বে না। গত সপ্তাহান্তে মার্কিন সামরিক বাহিনী এই অঞ্চলে একটি মহড়ার ঘোষণা দিয়েছে, যার উদ্দেশ্য হলো যুদ্ধকালীন বিমান শক্তি মোতায়েন ও পরিচালনার সক্ষমতা প্রদর্শন করা।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের হামলার লক্ষ্য গত জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের মতো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি দুর্বল করা নয়; বরং ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং জীবনযাত্রা নিয়ে ক্ষুব্ধ ইরানিদের আবারও রাস্তায় নামিয়ে আনা। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ইরানে মুদ্রাস্ফীতি ৬০ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলি লারিজানি দাবি করেছেন, হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামাজিক সংহতি নষ্ট করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প দেশটিকে জরুরি অবস্থার মধ্যে তুলে ধরার যে চেষ্টা করছেন, তা নিজেই এক ধরনের যুদ্ধ। তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘সন্ত্রাসবাদী বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন’ একটি গোষ্ঠী হিসেবে অভিহিত করে বলেন, তাদের লক্ষ্য হলো গৃহযুদ্ধ উসকে দেওয়া।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই তার সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির গোপন আলোচনার খবরকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। উইটকফ সম্প্রতি তার দাবিতে জাতিসংঘ পরিদর্শক দলের প্রত্যাবর্তন এবং ইরানের উচ্চ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম সরিয়ে নেয়ার মতো বিষয়গুলো যুক্ত করেছেন।
বাঘাই হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যে কোনো আগ্রাসনের ‘ব্যাপক এবং অনুশোচনাযোগ্য’ জবাব দেওয়া হবে। অন্যদিকে, ইরানের প্রধান বিচারপতি গোলাম হোসেইন মোহসেনি আমেরিকার সঙ্গে আবারও আলোচনার টেবিলে না ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন।
দুই সপ্তাহ আগে বিক্ষোভের সময় ট্রাম্প সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা ইসরাইলের সুরক্ষার নিশ্চয়তা না পেয়ে হামলা থেকে পিছিয়ে এসেছিলেন। অনেক ইরানি নাগরিক বিক্ষোভকারীদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করায় ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ। ৯০ মিলিয়ন মানুষের একটি দেশে ‘শাসন পরিবর্তন’ করা হবে কি না, তা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনও বিভক্ত।
এদিকে, হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সির মতে, নিহতের সংখ্যা ৫,৪১৯ জন এবং তারা আরও ১৭,০০০ মৃত্যুর ঘটনা তদন্ত করছে।
জাতিসংঘের বিশেষ দূত মাই সাতো জানিয়েছেন, পরিবারগুলো নিহত স্বজনদের মৃতদেহ ফেরত পেতে ৫,০০০ থেকে ৭,০০০ ডলার মুক্তিপণের শিকার হচ্ছে, যদিও ইরান সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। গত ৮ জানুয়ারি থেকে ইন্টারনেট পরিষেবা সীমিত করা হয়েছে। ইউরোপে ইতালির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তোনিও তাজানি ইউরোপীয় ইউনিয়নে আইআরজিসিকে নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করবেন বলে জানিয়েছেন।