সামরিক সংঘাত এড়াতে সরাসরি সংলাপে বসছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র

সামরিক হুমকি পাল্টা হুমকির পরিবর্তনে নতুন পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। সামরিক হামলার হুমকি এড়াতে ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পুনরায় পারমাণবিক আলোচনা শুরু করার বিষয়ে একটি প্রাথমিক সম্মতি মিলেছে। গত গ্রীষ্মে ট্রাম্প প্রশাসন কর্তৃক ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার পর এটিই হতে যাচ্ছে দুই দেশের মধ্যে প্রথম কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা।

সোমবার তিনটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে সিএনএন জানিয়েছে, শুক্রবার ইস্তাম্বুলে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাগচি, মার্কিন বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারের সাথে বৈঠকে বসতে পারেন। পরে ইরানি প্রেসিডেন্টও আলোচনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, তবে তা কিছু শর্তসাপেক্ষে।

মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান লেখেন,  আমি আমার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দিয়েছি, যদি একটি উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান থাকে, যা হুমকি এবং অযৌক্তিক প্রত্যাশা থেকে মুক্ত- তবে মর্যাদা, বিচক্ষণতা এবং উপযোগিতার নীতিগুলো অনুসরণ করে একটি ন্যায্য ও ন্যায়সংগত আলোচনার পথে অগ্রসর হতে।

পেজেশকিয়ান জানান, অঞ্চলের বন্ধুপ্রতিম সরকারগুলোর অনুরোধে তিনি এই আলোচনার সবুজ সংকেত দিয়েছেন। তিনি যোগ করেন, এই আলোচনা আমাদের জাতীয় স্বার্থের কাঠামোর মধ্যেই পরিচালিত হবে।

622491716_1179338164183221_5160304198312946145_n

পেজেশকিয়ান প্রেসিডেন্ট হলেও ইরানের চূড়ান্ত ক্ষমতার অধিকারী হলেন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তিনি গত রোববার তেহরানে এক চ্যালেঞ্জিং সুরে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের ওপর যে কোনো মার্কিন হামলা একটি আঞ্চলিক যুদ্ধের জন্ম দেবে।

গত কয়েক সপ্তাহ ধরে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে নৌ-বহর পাঠিয়েছেন এবং হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ইরান যদি নতুন পারমাণবিক চুক্তির বিষয়ে আলোচনায় রাজি না হয় তবে আবারও হামলা চালানো হবে। এছাড়া জানুয়ারির শুরুর দিকে ইরানে দেশব্যাপী বিক্ষোভের ওপর নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী দমনপীড়নের প্রতিক্রিয়ায় ট্রাম্প সামরিক ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়েও সতর্ক করেন। 

সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অবগত ব্যক্তিরা গত সপ্তাহে সিএনএনকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প ইরানের নেতা, পারমাণবিক স্থাপনা এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিমান হামলার মতো বিকল্পগুলো বিবেচনা করছেন। বর্তমানে একটি মার্কিন ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ ওই অঞ্চলে অবস্থান করছে, যা ইরানের বিরুদ্ধে যে কোনো সম্ভাব্য অভিযানে সহায়তা করতে পারে।

অন্যদিকে, ধারণা করা হয়, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু করার মতো হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ইরানের হাতে রয়েছে। তারা এসব ঘাঁটি এবং ইসরাইলে হামলা চালানোর হুমকি আড়ে থেকেই দিয়ে রেখেছে।

সবার নজর ইস্তাম্বুলে: গত কয়েক দিনে যুদ্ধের ঝুঁকি এড়াতে এবং একটি সমাধান খুঁজে পেতে আঞ্চলিক নেতাদের মধ্যে ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে। কাতার, তুরস্ক এবং মিশর এই প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করার প্রস্তাব দিয়েছে।

সিএনএন-এর সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইস্তাম্বুল আলোচনায় মিশর, ওমান, পাকিস্তান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও উপস্থিত থাকতে পারেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ মঙ্গলবার বলেছেন, এই অঞ্চলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের প্রয়োজন নেই এবং মধ্যপ্রাচ্য ইতিমধ্যে বহু ধ্বংসাত্মক সংঘাতের মধ্য দিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, ইরানের এখন একটি চুক্তিতে পৌঁছানো প্রয়োজন।

622838535_1198559309064694_6761626027625936483_n

ট্রাম্প আলোচনার বিষয়ে কিছুটা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। রোববার সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ইরান আমাদের সাথে কথা বলছে, গুরুত্ব সহকারে কথা বলছে। আরাগচিও রোববার সিএনএনকে বলেছেন, তিনি একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী।

তবে ইরানের অন্যান্য নেতারা আরও কঠোর সুর অবলম্বন করেছেন। ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পররাষ্ট্র নীতি প্রধান আলী বাঘেরি সোমবার জানিয়েছেন, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিয়ে আলোচনা করার কোনো ইচ্ছা তাদের নেই।

গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল যে, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করছে। সংস্থাটি উল্লেখ করে, পারমাণবিক অস্ত্র নেই এমন দেশগুলোর মধ্যে ইরানই একমাত্র দেশ যারা এমনটি করছে।

সোমবার খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা আলী শামখানি লেবাননের সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, ইরান যদি সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কমাতে চায় তবে যুক্তরাষ্ট্রকেও বিনিময়ে কিছু দিতে হবে।

সাম্প্রতিক মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের সাথে পরিচিত এক ব্যক্তির মতে, গত বছরের হামলার পর থেকে ইরান তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো মাটির আরও গভীরে পুনর্নির্মাণের চেষ্টা করছে। এছাড়া দেশটি জাতিসংঘকেও তাদের পারমাণবিক স্থাপনা পরিদর্শনে বাধা দিয়েছে।

624304772_887316054025739_2131417624518801029_n

২০২৫ সালের এপ্রিল ও মে মাসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র বেশ কয়েক দফা পরোক্ষ আলোচনা চালিয়েছিল। কিন্তু জুনের মাঝামাঝি সময়ে ইরানের ওপর ইসরাইলের আকস্মিক হামলার পর সেই আলোচনা বাতিল হয়ে যায়। এর কয়েক দিন পরেই যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা চালালে পুরো প্রক্রিয়াটি কার্যকরভাবে বন্ধ হয়ে যায়। ইরান এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি আলোচনার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছিল।