ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার প্রস্তাবিত রূপরেখা চূড়ান্ত!

শুক্রবার অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আলোচনার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালার রূপরেখা চূড়ান্ত হয়েছে। আলোচনার সাথে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের বরাতে আল জাজিরা জানিয়েছে, এই রূপরেখায় ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

আলোচনার স্পর্শকাতরতার কারণে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকসহ সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রস্তাবিত এই রূপরেখার মূল পয়েন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহারের ওপর বিধিনিষেধ এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অস্ত্র সহায়তা বন্ধ করা।

এদিকে একটি ইরানি সূত্র আলাদাভাবে আল জাজিরাকে জানিয়েছে, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির উপস্থিতিতে এই আলোচনা তুরস্কে হওয়ার কথা থাকলেও এখন তা ওমানে অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক টানাপোড়েনের পর মাস্কাটেই বৈঠক হচ্ছে।

কূটনীতির এই সংকীর্ণ সুযোগ এমন এক সময়ে এলো যখন পুরো অঞ্চল একটি সম্ভাব্য মার্কিন হামলার আশঙ্কায় রয়েছে। গত মাসে ইরানে বিক্ষোভকারীদের ওপর ভয়াবহ দমন-পীড়নের পর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আরব সাগরে মার্কিন বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন।

একটি সম্ভাব্য চুক্তির প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, ইরান আগামী তিন বছরের জন্য শূন্য পর্যায়ে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে সম্মত হবে। এরপর সমৃদ্ধকরণের মাত্রা ১.৫ শতাংশের নিচে রাখতে হবে। ইরানের বর্তমান উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত (যার মধ্যে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ) তৃতীয় কোনো দেশে স্থানান্তর করা হবে।

এই রূপরেখা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির গণ্ডি ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত। মধ্যস্থতাকারীরা প্রস্তাব করেছেন, ইরান তার আঞ্চলিক অ-রাষ্ট্রীয় মিত্রদের কাছে অস্ত্র ও প্রযুক্তি হস্তান্তর না করতে রাজি হবে। তেহরান এই কাঠামোর আওতায় ব্যালিস্টিক মিসাইল আগে ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দেবে। তবে, এটি ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইলের সংখ্যা ও পাল্লা কমানোর মার্কিন দাবির চেয়ে কিছুটা কম।

একজন সূত্রের মতে, মধ্যস্থতাকারী তিনটি পক্ষ তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি ‘অ-আক্রমণ চুক্তি’ প্রস্তাব করেছে।

এই প্রস্তাবের বিষয়ে ওয়াশিংটন বা তেহরান এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্র স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, যেকোনো চুক্তিতে অবশ্যই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, মিসাইল এবং প্রক্সি বাহিনীর ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে।

অতীত ও বর্তমান প্রেক্ষাপট: ২০১৫ সালে একটি চুক্তির মাধ্যমে ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু ২০১৮ সালে ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন। ইরান এ পর্যন্ত তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং আঞ্চলিক মিত্রদের সহায়তার বিষয়ে কোনো আপস করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছে। গত বুধবারও ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, তেহরান শুধুমাত্র পারমাণবিক কর্মসূচি এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে আলোচনা করতে অনড় রয়েছে।

একটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি:  গত মঙ্গলবার ইসরাইল সফরের সময় মার্কিন দূত ডেভিড উইটকফ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং গোয়েন্দা প্রধানদের সাথে সাক্ষাতের ঠিক আগেই মধ্যস্থতাকারীদের এই প্রস্তাবটি পেশ করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থেকে এই আলোচনায় বসছে।

কারণ ইরান অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক উভয় দিক থেকে নজিরবিহীন চাপে রয়েছে। একদিকে, আরব সাগরে মার্কিন রণতরী ও যুদ্ধবিমানের উপস্থিতি সামরিক হুমকি তৈরি করছে, অন্যদিকে ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে দেশব্যাপী বিক্ষোভ ইরানকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

তা সত্ত্বেও, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এখনো কঠোর মনোভাব বজায় রেখেছেন। তেহরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চরম আস্থার অভাব থাকায় বিশ্লেষকরা যেকোনো বড় ধরনের সমঝোতার বিষয়ে সন্দিহান।

পুনরায় কূটনীতির চেষ্টা: যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও এটিই প্রথম আলোচনার চেষ্টা নয়। গত জুনেও মাস্কাটে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনার তোড়জোড় চলেছিল, কিন্তু ইসরাইল ইরানে হামলা চালানোয় সেই প্রক্রিয়া থমকে যায়। সেই সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় এবং ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে প্রতীকী হামলা চালায়।

বর্তমানে উত্তেজনা তুঙ্গে: গত মঙ্গলবারও মার্কিন রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিঙ্কন’ -এর কাছে আসা একটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করেছে যুক্তরাষ্ট্র। একই দিনে হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন পতাকাবাহী বাণিজ্যিক জাহাজকে ইরানি বাহিনী কর্তৃক হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে।