ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে মাস্কাটে অনুষ্ঠিত আলোচনার রেশ ধরে ওমানে পৌঁছেছেন ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিব আলী লারিজানি। মঙ্গলবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনা এই তথ্য জানিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা লারিজানি ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আল-বুসাইদি এবং সুলতান হাইথাম বিন তারিক আল সাঈদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বুসাইদি এই আলোচনায় প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছেন।
ইরনা জানিয়েছে, লারিজানির এই সফরের এজেন্ডায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির পাশাপাশি দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার বিষয়টিও রয়েছে।
আল জাজিরা জানিয়েছে, বিশ্লেষকরা লারিজানির এই সফরকে আলোচনার অগ্রগতির একটি ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। গত সপ্তাহে ওমান এই আলোচনার আয়োজন করে, যার মূল লক্ষ্য ছিল তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা এবং অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য সংঘাত এড়ানো। আলোচনার দ্বিতীয় ধাপ নিশ্চিত করা হলেও এখনো কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি।
ইসরাইলি প্রভাবের নিন্দা তেহরানের: মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই জানান, লারিজানির এই সফর প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের পূর্বপরিকল্পিত অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ওয়াশিংটনকে অবশ্যই ধ্বংসাত্মক চাপ মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে হবে। তিনি আরও দাবি করেন, ইসরাইল ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে একটি কৃত্রিম সংকট হিসেবে উপস্থাপন করে ভিত্তিহীন ভয় ছড়াচ্ছে।
বাঘাই জানান, গত বছর কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ভেস্তে যাওয়ার পর প্রথম বৈঠকেই বিস্তারিত আলোচনার আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। এবারের মাসকাট বৈঠকটি ছিল সংক্ষিপ্ত এবং মূলত অপর পক্ষের গুরুত্ব যাচাই করার জন্য। তিনি আরও যোগ করেন, ইউরোপীয় দেশগুলো অতীতে গঠনমূলক ভূমিকা পালনের সুযোগ হারিয়েছে এবং সম্প্রতি আইআরজিসিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা একটি কৌশলগত ভুল। ওমান সফর শেষে লারিজানির কাতার যাওয়ার কথা রয়েছে।
ইউরেনিয়াম হ্রাসের ইঙ্গিত: আলোচনার বিষয়ে দুই পক্ষ থেকে মিশ্র সংকেত পাওয়া গেলেও, সোমবার ইরানের পরমাণু শক্তি প্রধান মোহাম্মদ এসলামি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র যদি সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, তবে ইরান তাদের উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম লঘু বা মিশ্রিত করতে প্রস্তুত। উল্লেখ্য, বর্তমানে ইরানের কাছে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ রয়েছে, যা অস্ত্র তৈরির মাত্রার (৯০ শতাংশ) খুব কাছাকাছি। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার দাবিতে অনড় রয়েছেন।
আমেরিকা এখন ব্যালিস্টিক মিসাইল ও আঞ্চলিক কর্মকাণ্ডসহ একটি সামগ্রিক প্যাকেজ নিয়ে আলোচনার কথা বলছে। অন্যদিকে, তেহরান চায় আলোচনা শুধু পরমাণু নীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকুক এবং সমস্যাগুলো একটি একটি করে সমাধান করা হোক।
পরবর্তী পদক্ষেপ: গত বছর পাঁচ দফা আলোচনার পর ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ নিয়ে বিরোধের জেরে প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। এরপর জুনে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ইরানের নাতাঞ্জ, ফোরডো এবং ইসফাহান পরমাণু কেন্দ্রে হামলা চালায়। তেহরান জানায়, ওই হামলার পর থেকে তারা সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।
এদিকে, লারিজানির ওমান সফরের মধ্যেই ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করতে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে চাপ দেবেন যেন ইরানের ব্যালিস্টিক মিসাইল কর্মসূচিকেও আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, তাদের মিসাইল কর্মসূচি নিয়ে কোনো আপস বা আলোচনা হবে না।