ইরানের রাজধানী তেহরানের ব্যস্ততত রাজপথের দালানে টানানো একটি বিশালাকৃতির পোস্টার নিয়ে এক দিকে যেমন শিরোনামে ঠাঁই পাচ্ছে, অন্যদিকে কাঁপাচ্ছে নেটদুনিয়াও। তেহরানে টানানো সেই ব্যানারে ইরান আক্রান্ত হলে ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলার হুমকি দেয়া হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তজনাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে এবং ট্রাম্প তেহরানের ওপর চাপ বৃদ্ধি করায় পারমাণবিক আলোচনা ও যুদ্ধাবস্থার আশঙ্কা ঘনীভূত হচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চরম উত্তজনার মাঝে তেহরানের প্যালেস্টাইন স্কয়ারে একটি ব্যানার প্রদর্শন করা হয়েছে। সেখানে হুমকি দেয়া হয়েছে, আইডিএফ বা মার্কিন সামরিক বাহিনী ইরান আক্রমণ করলে ইসরাইলে পাল্টা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হবে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ব্যানারে থাকা মানচিত্র থেকে জেরুজালেমকে বাদ দেয়া হয়েছে। তবে ব্যানারটির সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
মানচিত্রটি ইসরাইলের মধ্যাঞ্চলকে তুলে ধরেছে, যেখানে বেন-গুরিয়ান বিমানবন্দর, তেলআবিবে আইডিএফ’র কিরিয়া সদর দপ্তর, হার্জলিয়ার কাছে গ্লিলটে আইডিএফ ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরেটের বেস এবং অন্যান্য কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ব্যানারে একটি সামরিক ডেস্কও দেখানো হয়েছে যেখানে একটি উজ্জ্বল লাল রঙের ‘ফায়ার’ বোতাম, একটি যুদ্ধবিমান, দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং একটি রেডিওর পাশাপাশি কিছু রাজনৈতিক নোট রয়েছে। ব্যানারের শিরোনামে ইংরেজিতে লেখা আছে, ‘শুরু করবে তোমরা... শেষ করব আমরা’।

ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেননি। তবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে।
চলতি সপ্তাহে ইরান ইস্যুতে আলোচনার জন্য নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করবেন। তিনি জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যে কোনো চুক্তিতে তেহরানকে অবশ্যই তাদের আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে (ইরানি অক্ষ) সমর্থন দেয়া বন্ধ করতে হবে, এ বিষয়টি তিনি পুনরায় ব্যক্ত করবেন।
ইরানের সঙ্গে এমন একটি পারমাণবিক চুক্তি করতে চাইছেন ট্রাম্প, যেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধের শর্ত থাকবে; একই সঙ্গে তিনি চাপের কৌশলও অব্যাহত রেখেছেন। ৭ ফেব্রুয়ারি মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ, জ্যারেড কুশনার এবং মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কমান্ডার ব্র্যাড কুপার আরব সাগরে অবস্থানরত রণতরি 'ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন' পরিদর্শন করেন।
ট্রাম্প ইরানের চারপাশে সামরিক উপস্থিতি বাড়িয়েছেন। মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের অবিলম্বে ইরান ত্যাগের নির্দেশ দিয়েছে এবং সতর্ক করেছে, তারা গ্রেপ্তার হতে পারেন। ট্রাম্প বলেছেন, সর্বোচ্চ নেতা খামেনির খুব চিন্তিত হওয়া উচিত। তদুপরি, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও যেসব দেশ ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, তাদের ওপর শুল্ক আরোপের একটি নির্বাহী আদেশেও তিনি সই করেছেন।
গত ৩৭ বছরে এই প্রথম ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি গত রোববার বিমানবাহিনীর কমান্ডারদের সঙ্গে বার্ষিক বৈঠকটি এড়িয়ে গেছেন। এমনকি কোভিড-১৯ মহামারীর সময়েও তিনি এই বৈঠকে হাজির ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কির হামলার হুমকিকে খামেনি জনসমক্ষে আসা থেকে বিরত রয়েছেন। তেহরান মূলত ২০২৫ সালের জুনের মতো হামলার আশঙ্কা করছে। তখন ট্রাম্প হামলার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে দুই সপ্তাহ সময় নেবেন বললেও মাত্র দু’দিন পরেই ফোরদো, নাতাঞ্জ এবং ইসফাহানের তিনটি প্রধান পারমাণবিক কেন্দ্রে মার্কিন বিমান ও নৌবাহিনীকে হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
দুই দেশের মধ্যে একটি পারমাণবিক চুক্তি হলে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি বন্ধ হতে পারে এবং উত্তেজনা প্রশমিত হতে পারে। বিশ্লেষকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, চুক্তির মাধ্যমে ইরানে আইএইএ পরিদর্শন পুনরায় শুরু করা সম্ভব হতে পারে, যা দীর্ঘ দিন থেকে বন্ধ।
তবে চুক্তি করা বেশ কঠিন, কারণ তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি অলোচনাযোগ্য নয়, অন্যদিকে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, কোনো চুক্তি হতে হলে তাতে অবশ্যই ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ এবং পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
সূত্র: আরটি, ওয়াইনেট, সানডে গার্ডিয়ান
