রোমানিয়ায় আছড়ে পড়ল রুশ ড্রোন, ক্ষ্যাপে গেলো ন্যাটো

ইউক্রেন সীমান্তে হামলা চালাতে গিয়ে এবার ন্যাটোর সদস্য রাষ্ট্র রোমানিয়ার একটি ১০ তলা আবাসিক ভবনে আছড়ে পড়েছে রাশিয়ার একটি বিস্ফোরকবাহী ড্রোন। শুক্রবার রাতের এই ভয়াবহ হামলায় এক নারী ও একটি শিশু সামান্য আহত হয়েছেন।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর এই প্রথম ন্যাটোর কোনো জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় রুশ ড্রোন আঘাত হানল এবং সরাসরি বেসামরিক মানুষ আহত হলেন। এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার পর রাশিয়ার বিরুদ্ধে ‘বেপরোয়া আচরণের’ তীব্র অভিযোগ তুলে ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুট হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, মিত্রপক্ষের প্রতি ইঞ্চি অঞ্চল রক্ষা করতে ন্যাটো সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

রোমানিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইউক্রেন সীমান্তবর্তী গালাতি শহরের আকাশসীমায় একটি রুশ ড্রোন অনুপ্রবেশ করে এবং রাডারের নজরদারি এড়িয়ে শহরের একটি আবাসিক ভবনে আঘাত হানে। ড্রোনটি আঘাতের সাথে সাথেই বিস্ফোরিত হয় এবং ১০ তলা ভবনের শীর্ষতলার একটি ফ্ল্যাটে মারাত্মক আগুন ধরে যায়।

Russian drone hit 01
ঘটনার পর আতঙ্কিত ৭০ জন বাসিন্দাকে দ্রুত ভবন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয় এবং আতঙ্কগ্রস্ত আরও দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর রোমানিয়ার শীর্ষ প্রতিরক্ষা পরিষদ জরুরি বৈঠকে বসেছে এবং রোমানিয়ায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তবে ক্রেমলিন বা মস্কোর পক্ষ থেকে এই ঘটনার পর তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

ন্যাটোর সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক রুট রোমানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিকোসর দানের সাথে টেলিফোনে কথা বলার পর সামাজিক মাধ্যম এক্সে লেখেন, রাশিয়ার এই বেপরোয়া আচরণ আমাদের সবার জন্য চরম বিপজ্জনক। আমি প্রেসিডেন্টকে আশ্বস্ত করেছি, ন্যাটো তার মিত্রদের প্রতি ইঞ্চি অঞ্চল রক্ষা করতে প্রস্তুত। ড্রোনসহ যেকোনো ধরনের হুমকি প্রতিরোধে আমরা আমাদের সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করব। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট দান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, রাশিয়ার এই কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন এবং ন্যাটোর একটি সদস্য রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপত্তার প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করে।

ইউক্রেনের সাথে প্রায় ৬৫০ কিলোমিটারের দীর্ঘ স্থল সীমান্ত থাকা রোমানিয়া জানিয়েছে, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণাঙ্গ আগ্রাসন শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ২৮ বার রুশ ড্রোন তাদের আকাশসীমা লঙ্ঘন করেছে। গালাতিতে বসবাসরত ৪৪ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক স্টিফেন এভলিন একে রাশিয়ার সরাসরি উসকানি উল্লেখ করে বলেন, আমি বিশ্বাস করি না এটা কোনো দুর্ঘটনা। রোমানিয়া সীমান্তে এটা এতবার ঘটেছে যে একে ভুল বলা যায় না। হয় রুশ বাহিনী যুদ্ধ পরিচালনায় চরম অযোগ্য, না হয় তারা ইচ্ছে করেই এটা করছে। ন্যাটোর এবার কঠোর কিছু করা উচিত।

Russian drone hit 03
রোমানিয়ার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল গেওর্গে মাক্সিম এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, ড্রোনটি মাত্র চার মিনিটের জন্য রোমানিয়ার আকাশসীমায় ছিল এবং রাডারের চোখ ফাঁকি দিতে মাত্র ১০ কিলোমিটার পথ অত্যন্ত কম উচ্চতা দিয়ে উড়ে আসে।

ড্রোন হানার খবর পেয়েই রোমানিয়া বিমানবাহিনীর দুটি এফ-১৬ ফাইটার জেট আকাশে ওড়ে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে একটি সামরিক হেলিকপ্টার পাঠানো হয়। পাইলটদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল জনবসতিহীন এলাকায় সুযোগ বুঝে ড্রোনটি গুলি করে নামানোর।

একই সঙ্গে ব্রাইলা, গালাতি ও তুলচিয়া নামক সীমান্তবর্তী কাউন্টিগুলোর বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার জন্য সতর্কতা জারি করা হয়। জেনারেল মাক্সিম আরও স্বীকার করেন, রুমানিয়ায় আমেরিকার তৈরি ‘মেরোপস’ অ্যান্টি-ড্রোণ সিস্টেম সচল থাকলেও তা জাতীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সাথে পুরোপুরি একীভূত না থাকায় শহরের ওপর তা ব্যবহার করা বেশ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল।

এই হামলার ফলে ভবনটির দুটি সিঁড়িঘর, একটি লিফট শ্যাফট এবং নিচে পার্ক করে রাখা ৫টি গাড়ি দুমড়ে-মুচড়ে গেছে। এর আগে গত এপ্রিলেও গালাতিতে একটি ড্রোন বিদ্যুতের খুঁটি ও একটি বাড়ির ওপর আছড়ে পড়েছিল। এছাড়া বৃহস্পতিবার উত্তর-পশ্চিম রোমানিয়ায় বিস্ফোরকহীন আরও একটি ড্রোনের সন্ধান মিলেছে, যার উৎস খতিয়ে দেখছে প্রশাসন।

রাশিয়ার এই ক্রমাগত আকাশসীমা লঙ্ঘনের মুখে রোমানিয়া সরকার ন্যাটোর কাছে আরও আধুনিক লো-অ্যালটিটিউড রাডার এবং ইন্টারসেপ্টর ড্রোন মোতায়েনের জরুরি অনুরোধ জানিয়েছে। ন্যাটো কর্তৃপক্ষও বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে বলে আশ্বস্ত করেছে। এই ঘটনার ফলে ন্যাটোর পূর্ব সীমান্তে যে যুদ্ধের উত্তেজনা নতুন করে মাত্রা ছাড়াল, তা বলাই বাহুল্য।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স