বিশ্বের যেকোনো শক্তির আগ্রাসনের মুখে ইরান কখনও বিচলিত হবে না এবং ‘কোনো দুর্বৃত্তের কাছে মাথানত করবে না’ বলে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন দেশটির রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় নিহত ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনেই-এর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতে তেহরানে আসা বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি এই মন্তব্য করেন।
প্রায় ১০০টি দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তেহরানে বৃহস্পতিবার একাধিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক করেন মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি এই সমাবেশগুলোকে ইরানের মিত্রদের সংহতির জন্য ধন্যবাদ জানানোর পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার বার্তা দিতে ব্যবহার করেন।
একটি বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেন, শত্রুরা ভেবেছিলো নেতাকে লক্ষ্যবস্তু করে এবং তীব্র চাপ প্রয়োগ করে ইসলামী প্রজাতন্ত্রকে ভেঙে ফেলা যাবে। কিন্তু এই পদক্ষেপের ফলে উল্টো ইরানি জাতির মধ্যে সংহতি ও জাতীয় ঐক্য আরও বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরও বলেন, কিছু দেশ বিভিন্ন জাতির ওপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে চায়, কিন্তু ইরানি জনগণ শক্তির কাছে নতি স্বীকার করবে না।
তাজিকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমোমালি রাহমনের সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান দুই দেশের গভীর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত বন্ধনের ওপর জোর দিয়ে বলেন, ইরান হলো তাজিক জনগণের দ্বিতীয় বাড়ি, আর তাজিকিস্তান হলো ইরানি জাতির দ্বিতীয় মাতৃভূমি।
আয়াতুল্লাহ খামেনেইয়ের শাহাদাতে গভীর শোক প্রকাশ করে তাজিক প্রেসিডেন্ট রাহমন বলেন, আমরা নিজেদের ইরানি জনগণের সঙ্গে এক পরিবার মনে করি। আমাদের মনে হয়েছে এই আগ্রাসন শুধু ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং আমাদের সবার বিরুদ্ধে ছিলো। তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদেরও বারবার মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, যুদ্ধের ভাষা দিয়ে ইরানি জাতিকে পিছু হটানো যাবে না।
ইরাকের রাষ্ট্রপতি নিজার আমিদির সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান মার্কিন-ইসরাইলি হামলাকে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেন। ইরাকের রাষ্ট্রপতি ইরানের জনগণের প্রতি সংহতি জানিয়ে বলেন, বিদেশি শক্তির উপস্থিতি ও সমর্থনের ওপর টেকসই নিরাপত্তা গড়ে তোলা যায় না। প্রকৃত নিরাপত্তা আসে আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে গঠনমূলক সম্পর্ক থেকে।
আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ানের সাথে সাক্ষাৎকালে পেজেশকিয়ান বলেন, দুই দেশের সম্পর্ককে বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত রাখা উচিত। পাশিনিয়ান ইরানের নিরাপত্তা সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়ে আশ্বস্ত করে বলেন, ইরানের স্বার্থ ও নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কোনো পরিকল্পনা বা কর্মকাণ্ডে আর্মেনিয়া অংশ নেয়নি এবং নেবেও না। আমরা কোনো অবস্থাতেই এই সম্পর্ককে কলঙ্কিত হতে দেবো না।
তুর্কমেনিস্তানের জাতীয় নেতা গুরবানগুলি বেরদিমুহামেদভের সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান জ্বালানি, পরিবহন ও বাণিজ্য চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের আহবান জানান। বের্দিমুহামেদভ বলেন, যুদ্ধ কখনোই সমস্যার টেকসই সমাধান হতে পারে না।
অন্যদিকে জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলি এই কঠিন সময়ে ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা দিয়ে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন অধ্যায় উন্মোচনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। জর্জিয়ার ভূখণ্ডগত অখণ্ডতার প্রতি ইরানের সমর্থনেরও প্রশংসা করেন তিনি।
তুরস্কের উপরাষ্ট্রপতি জেভদেত ইলমাজের সাথে বৈঠকে পেজেশকিয়ান ইসলামী ঐক্য শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে বলেন, মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে যত বেশি সংহতি থাকবে, ধ্বংসাত্মক শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপের সুযোগ ততো কমবে।
তুর্কি উপরাষ্ট্রপতি রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশ করে জেভদেত ইলমাজ বলেন, এই কঠিন পরিস্থিতিতে সমগ্র বিশ্ব ইরানি জাতির দৃঢ়তা ও প্রতিরোধের সাক্ষী হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সংঘাতের বিস্তার রোধে কাতার ও পাকিস্তানসহ আঞ্চলিক দেশগুলোর সাথে তুরস্কের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেন।