ওয়াংচুকের সঙ্গে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সাক্ষাৎ, শিক্ষা সংস্কারে মোদীর আশ্বাস

ভারতের জাতীয় প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নিট-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা সংস্কারের দাবিতে উত্তাল আন্দোলনের মধ্যে অনশনরত বিশিষ্ট সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে হাসপাতালে বৈঠক করেছেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীরা। একই সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিট পরীক্ষার অনিয়মকে ‘ঘোর পাপ’ বলে আখ্যা দিয়ে কঠোর ব্যবস্থার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং সংসদে শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন। তবে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে নয়া দিল্লির যন্তর মন্তরে হাজার হাজার আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক সমর্থক অবস্থান ধরে রাখায় রাজধানীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। খবর দ্য হিন্দু ও এনডিটিভির।

অনশনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশানুসারে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) তাকে দিল্লির সাফদারজং হাসপাতাল থেকে গুরুগ্রামের মেদান্তা হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। সেখানে তার চিকিৎসা পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।

দ্য হিন্দু এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, হাসপাতালে স্থানান্তরের পরপরই কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে. পি. নাড্ডা এবং রাজ্যমন্ত্রী ড. জিতেন্দ্র সিং মেদান্তা হাসপাতালে গিয়ে ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন। প্রশাসনিক ও সরকারের উচ্চপর্যায়ের সূত্র অনুযায়ী, শিগগিরই জাতীয় সংসদে শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক সংস্কার ও পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনার বিষয়ে সরকারি সিদ্ধান্তের কথা তারা ওয়াংচুককে অবহিত করেন। মন্ত্রীরা তাকে আশ্বাস দেন যে, শিক্ষার্থীদের দাবি এবং শিক্ষা সংস্কারের বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। আন্দোলনরত ছাত্র-ছাত্রীরা যেন সরকারের এই প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখে এবং পরিস্থিতি যাতে আর কোনোভাবেই সহিংস রূপ না নেয়, সে জন্য আন্দোলনকারীদের কাছে আবেদন জানানোর অনুরোধ করা হয় ওয়াংচুকের প্রতি।

এদিকে, বুধবার (২২ জুলাই) সকাল থেকেই দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তর প্রতিবাদস্থলে ককরোজ জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থক এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ঢল নামে। সংগঠনটি এক্স-এ পোস্ট করে প্রশ্ন তুলেছে, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান কবে পদত্যাগ করছেন? তারা দাবি করেছে যে প্রতিবাদস্থলে এই মুহূর্তে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী অবস্থান করছেন।

এর আগে সোমবার ‘সংসদ চলো’ মিছিলের ওপর পুলিশি দমনপীড়নের ঘটনা ঘটলে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টির (এনসিপি-শারদ পাওয়ার) সভাপতি শারদ পাওয়ার এবং আম আদমি পার্টির (আপ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালসহ একাধিক হেভিওয়েট বিরোধী নেতা যন্তর মন্তরে হাজির হন। তারা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন এবং পরীক্ষায় কথিত ভয়াবহ অনিয়মের তীব্র নিন্দা জানান।

মিছিল ও অবস্থান কর্মসূচি চলাকালীন ছড়িয়ে পড়া সহিংসতা, দাঙ্গা, দায়িত্বরত সরকারি কর্মচারীদের ওপর হামলা এবং সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিসাধনের অভিযোগে মঙ্গলবার দিল্লি পুলিশ অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পাঁচটি এফআইআর দায়ের করেছে। বিশেষ করে, র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ)-এর এক জওয়ানকে একদল বিক্ষোভকারী ধাওয়া করে মারধর করছে—এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর পুলিশ আলাদা একটি মামলা নথিভুক্ত করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, ভিডিও ফুটেজ দেখে হামলায় জড়িতদের চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে।

রাজধানীর রাজপথে পুলিশি কঠোরতা সত্ত্বেও এক অভিনব জনসংহতির ছবি দেখা গেছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ও বিদেশ থেকে আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানাতে সাধারণ মানুষ অনলাইনের মাধ্যমে খাবার পাঠাচ্ছেন। যন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থলের সুনির্দিষ্ট ঠিকানা ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের জন্য ডেলিভারি অ্যাপে পিৎজা, বার্গার, মোমো থেকে শুরু করে থালি পর্যন্ত বিভিন্ন খাবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে দিল্লিতে সিজেপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিক্ষোভ এবং চলমান সংসদ অধিবেশনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় রাজধানীতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নজিরবিহীনভাবে জোরদার করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (এমএইচএ) নির্দেশে সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) ২০টি অতিরিক্ত কোম্পানি মোতায়েন করা হচ্ছে। কলকাতা থেকে বিমানে করে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে এই সিআরপিএফ জোয়ানদের নতুন দিল্লিতে পৌঁছানোর কাজ চলছে। আইনশৃঙ্খলা যাতে কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সে জন্য স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে বিএসএফ ও আরএএফ বাহিনীর পাশাপাশি অতিরিক্ত বলবৎ করা হচ্ছে।

নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস ও ছাত্র বিক্ষোভের জেরে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে বিরোধী দলগুলো। জাতীয় লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী মঙ্গলবার সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন যে সরকার শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে এবং আন্দোলন দমনে পুলিশি বর্বরতা চালাচ্ছে। রাহুল গান্ধী অবিলম্বে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করেছেন। মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে অবস্থান নেওয়ার সময় রাহুল গান্ধীকে সাময়িকভাবে আটক করে দিল্লি পুলিশ। রাহুল গান্ধী সংসদে উন্মুক্ত বিতর্ক, আন্দোলনকারী ছাত্রদের ওপর হামলা চালানো পুলিশ সদস্যদের শাস্তি এবং দমনপীড়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছেন।

তবে বিরোধীদের এই আক্রমণের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, কংগ্রেসের উদ্দেশ্য সমাধান খোঁজা নয়, তারা শিক্ষার্থীদের ইস্যু নিয়ে রাজনীতি ও নাটক করছে। সরকার সংসদে এই নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত থাকার পরও বিরোধীদলগুলো অহেতুক বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।

এনডিটিভি এক প্রতিবেদনে জানায়, সরকারি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, নিট অনিয়মের খবর প্রকাশ্যে আসার পরপরই সরকার তদন্তের দায়িত্ব সিবিআই-কে দিয়েছে। এ পর্যন্ত অন্তত ১৩ জন মূল অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী নৈতিক দায়িত্ব মেনেই একাধিক প্রশাসনিক ও সংস্কারমূলক পদক্ষেপ কার্যকর করছেন। সূত্রগুলো পদত্যাগের দাবিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছে।

দিল্লির এই উত্তাল পরিস্থিতির মধ্যে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিট পরীক্ষার অনিয়ম নিয়ে তার প্রথম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ‘ঘোর পাপ’-এর সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। জড়িতদের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কেউ তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো চক্রান্ত করতে না পারে। এনডিএ সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি কোনো একক দলের রাজনীতি নয়, এটি সমগ্র জাতির স্বার্থের বিষয়। এ জন্য কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলোকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে এবং যুবসমাজের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। কোনো শিক্ষার্থীর সঙ্গে যাতে অন্যায় না হয়, সরকার তা নিশ্চিত করবে। বিরোধীদের দাবি মেনে নিট ইস্যু নিয়ে সংসদে দীর্ঘ আলোচনার আয়োজন করতেও সরকার পিছপা হবে না বলে নিশ্চিত করেছে সরকারি সূত্র।