নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৬৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন আট শতাধিক পর্যটক-তীর্থযাত্রী। তাদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। ভয়াবহ এই দুর্যোগে বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং বিস্তীর্ণ এলাকায় যোগাযোগব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা ধরা পড়েছে সীমান্ত এলাকার একাধিক নজরদারি ক্যামেরায়। এসব ভিডিওতে দেখা যায়, একাধিক উঁচু ভবন ও স্থাপনার ওপর আছড়ে পড়ছে কাদা ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত। প্রাণ বাঁচাতে ছুটছেন শত শত মানুষ। মুহূর্তেই প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বাস ও গাড়ি।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, হিমবাহ ধসে এ দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। পরে ধ্বংসাবশেষ ও পানির প্রবল স্রোত নিচের দিকে নেমে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে।
ভয়াবহ গর্জনে পানি ও কাদার স্রোত ভুটে কোশি ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী গ্রাম ও শহরগুলোতে আঘাত হানে। নেপালের পুলিশ জানিয়েছে, তারা ১৬২টি মরদেহ উদ্ধার করেছে।
অন্যদিকে, সীমান্তের ওপারে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বতের গিরং বন্দরে ভূমিধসের ঘটনায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। সেখানে এখনও ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুর্যোগ আঘাত হানার কয়েক ঘণ্টা পর প্রায় ৪০৩ জন পর্যটকের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। তাদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি।
নিখোঁজদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয়সহ অস্ট্রেলিয়া, ব্রিটেন, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও রয়েছেন বলে পর্যটন বোর্ড জানিয়েছে।
দুর্যোগের ভয়াবহতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিস ফেডারেশনের (আইএফআরসি) নেপালপ্রধান ডেভিড ফিশার বলেন, ‘পুরো গ্রাম ও বাজার এলাকা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’
সংস্থাটি জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য কম্বল, প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম, স্ট্রেচার ও মরদেহ বহনের ব্যাগসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানো হচ্ছে।
নেপালের ৫৬ বছর বয়সী রাজু ভাদেল জানান, বিপদে থাকা তার ভগ্নিপতির কাছ থেকে তিনি ফোন পেয়েছিলেন।
তিনি বলেন, তারা কাঁদছিলেন এবং বলেছিলেন, তাদের পুরো বাড়ি ভেসে গেছে। পরিবারের তিন সদস্যকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে তার ভাই এখনো নিখোঁজ।
চলছে উদ্ধার অভিযান
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, তিব্বত সরকারের কর্মকর্তারা উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য প্রায় ৮০০ জরুরি কর্মী ও ১৫০টি যানবাহন মোতায়েন করেছেন। তাদের সঙ্গে রয়েছে অনুসন্ধানী কুকুর ও দ্রুতগতির নৌকা।
নেপালি সেনাবাহিনীও আকাশপথে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। তারা বহু মানুষকে উদ্ধার করেছে। নদীর কাছাকাছি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে।
নেপালের উত্তরের রাসুয়া জেলা বন্যায় সবচেয়ে আগে আক্রান্ত হয়। পরে বন্যার পানি নিচের দিকে প্রবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মোট সাতটি নেপালি জেলায় মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দক্ষিণে ভারতের সীমান্তবর্তী চিতওয়ান পর্যন্ত এ বন্যা ছড়িয়ে পড়েছে।
নেপালের পুলিশ প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, নদীর ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবল স্রোতে বয়ে যাচ্ছে এবং পথে থাকা বাড়িঘর ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এএফপির ছবিতে দেখা গেছে, কাদায় ডুবে থাকা মাটির ওপর একটি বাড়ির ওপরের তলা বেরিয়ে রয়েছে।
বহুতল ভবনগুলো বন্যার পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় কাদা ও পাঁকের মধ্যেই জীবিতদের সন্ধানে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
নতুন করে বন্যার আশঙ্কা
ভয়াবহ এই দুর্যোগের পর নতুন করে বন্যার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, নদীতে এখনো যে বাধা রয়েছে, তা ভেঙে গেলে ফের বন্যা দেখা দিতে পারে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান চিয়াংগং ঝাং দ্বিতীয় দফায় বন্যার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন।
তিনি এএফপিকে বলেন, নেপাল-চীন সীমান্তের নদীর উজানে এখনো একটি বাধা আটকে রয়েছে। কর্তৃপক্ষ সতর্ক করেছে, দ্বিতীয় দফায় বন্যা হতে পারে।
তিব্বতের শিগাতসে এলাকার সড়ক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সেখানকার সড়কগুলো ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং চলাচলের জন্য নিরাপদ নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বৃহস্পতিবার জানায়, প্রাথমিকভাবে যে ঘটনাটিকে ভূমিকম্প বলা হয়েছিল, সেটি আসলে ছিল ‘হিমবাহ ধস ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত’। এর ফলে নিচের দিকে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে।
কেন এতো পর্যটক ছিলেন?
জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে নিয়মিত প্রাণঘাতী বন্যা ও ভূমিধস হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এ অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা আরও ঘন ঘন ঘটছে এবং এর তীব্রতাও বাড়ছে।
বর্ষা মৌসুমে অনেক ট্রেকিং কোম্পানি পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ রাখে। তবে এ সময়ে ওই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পর্যটক ও তীর্থযাত্রী থাকেন।
বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে জনপ্রিয় ট্রেকিং এলাকাগুলোর প্রবেশদ্বার সিয়াব্রুবেসি। এছাড়া বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পবিত্র স্থান কৈলাস পর্বতের পাদদেশে যাওয়া তীর্থযাত্রীরাও সেখানে ছিলেন।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও প্রতিকূল আবহাওয়া বারবার এই অঞ্চলের ঝুঁকির কথা মনে করিয়ে দিলেও ধর্মীয় বিশ্বাস ও আধ্যাত্মিক আকর্ষণে প্রতিবছর হাজারো পর্যটক ও তীর্থযাত্রী এই দুর্গম পথ পাড়ি দেন।
আর এবার সেই দুর্গম তীর্থপথেই ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধস কেড়ে নিয়েছে প্রাণ, নিখোঁজ করেছে শত শত পর্যটক-তীর্থযাত্রীকে।