নেপালে তিন ঘণ্টা পর উদ্ধারকাজ শুরু, নিহত বেড়ে ৫৪৭

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ হিমবাহ ধসে সৃষ্ট কৃত্রিম হ্রদ উপচে পড়ার ঝুঁকি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসায় নেপাল ও চীন অংশে সাময়িকভাবে স্থগিত থাকা উদ্ধার অভিযান পুনরায় শুরু হয়েছে। জলস্তর অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে যে ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের আশঙ্কা তৈরি হয়েছিলো, তা কিছুটা কমে আসায় স্বস্তি ফিরেছে উদ্ধারকর্মীদের মধ্যে। খবর রয়টার্সের।

বুধবারের (২৬ আগস্ট) ভয়াবহ বন্যা ও ধসে নেপালে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৪৭ জনে। অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশে পাঁচজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। দুই দেশ মিলিয়ে এখনো প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

হিমবাহ ধসের পর পাহাড়ি নদী ধরে পাথর, বরফ, কাদা ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের স্রোত নেমে এসে নদীর গতিপথ অবরুদ্ধ করে ফেলে। এতে একটি বিশাল কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয়, যেখানে ক্রমাগত পানি জমতে থাকায় নিম্নাঞ্চলের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকে।

হ্রদ উপচে পড়ার শঙ্কা ও আতঙ্ক

নেপালের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার হ্রদটির জলাধারে জমে থাকা পানির পরিমাণ আগের দিনের আনুমানিক ১৫ থেকে ২০ লাখ ঘনমিটার থেকে একলাফে বেড়ে ২৫ লাখ ঘনমিটারে পৌঁছায়। অতিরিক্ত এই পানি উপচে পড়ে প্রথমে লেন্দে খোলা নদী এবং পরবর্তীতে ত্রিশূলী নদীতে এসে মিশতে শুরু করে।

হ্রদের পানি উপচে পড়ার সংবাদে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে নেপাল ও চীনের সীমান্ত এলাকায়। সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়াতে নেপাল কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার কাজ প্রায় তিন ঘণ্টার জন্য স্থগিত রাখে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি জানায়, বাঁধ ভেঙে পড়ার প্রবল ঝুঁকিতে সীমান্ত এলাকার চীনা অংশে নিয়োজিত সমস্ত উদ্ধারকর্মী ও যানবাহন সরিয়ে নিয়ে নিরাপদ স্থানে অপেক্ষায় রাখা হয়।

পরবর্তীতে পানি বৃদ্ধির মাত্রা কমে এলে উভয় পক্ষই পুনরায় উদ্ধার অভিযানে নামে। নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেট রয়টার্সকে জানান, বন্যার আগাম সতর্কতার কারণে উদ্ধার কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলেও দেখা গেছে নদীর পানি শেষ পর্যন্ত মাত্র শূন্য দশমিক ছয় মিটার (প্রায় দুই ফুট) বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে আবারও পুরোদমে উদ্ধারকাজ চালু করা হয়।

একই তথ্য নিশ্চিত করে চীনা রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যম সিসিটিভি জানায়, দুপুর নাগাদ উজানের বাঁধ দেওয়া হ্রদের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে মনে হওয়ায় জিরং এলাকার ভূমিধস এলাকায় উদ্ধার অভিযান দ্রুত পুনরায় শুরু এবং আরও জোরদার করা হয়েছে।

ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে দুই দেশের সংযোগ পথ

গত বুধবারের আকস্মিক ঢল ও কাদাস্রোত সীমান্ত সংলগ্ন একাধিক গ্রাম ও উপত্যকা মুহূর্তের মধ্যে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছে। ধ্বংস হয়ে গেছে কাঠমান্ডুর সঙ্গে তিব্বতের লাসাকে যুক্ত করা অত্যন্ত জনপ্রিয় বাণিজ্যিক ও পর্যটন পথের একাধিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সড়ক ও সেতু। নিখোঁজ মানুষের তালিকায় রয়েছেন অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের একটি বড়ো অংশ ভারত থেকে আসা হিন্দু তীর্থযাত্রী, যারা তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর হ্রদের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা রেড ক্রস জানিয়েছে, এই বিপর্যয়ে ৯০ হাজারেরও বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। পাহাড়ি ধসে হ্রদ তৈরি ও সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উপদ্রুত এলাকায় ত্রাণবাহী ট্রাক ও যানবাহনগুলো আটকে পড়েছে।

চীনের উচ্চপর্যায়ের তৎপরতা ও বৈশ্বিক উদ্বেগ

পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিচারে বেইজিংয়ে চীনের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পলিটব্যুরো শুক্রবার জরুরি বৈঠক করেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অনুসন্ধান ও উদ্ধার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে চীন ও বিদেশি নিখোঁজ নাগরিকদের সন্ধানে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে হিমবাহ হ্রদগুলোর গতিবিধি, ভূমিধসের ঝুঁকি এবং প্রাকৃতিক বাঁধগুলোর ওপর সার্বক্ষণিক কড়া নজরদারি চালানোর তাগিদ দেওয়া হয়। নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে জরুরি সহায়তা পাঠানো এবং আন্তর্জাতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার করার আহবান জানান শি জিনপিং।

এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে চীনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রভাবশালী নেতা, প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং নিজেই তিব্বতের দুর্যোগ-কবলিত জিরং এলাকা পরিদর্শনে যান। বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে এই ঘটনাকে যে সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে, প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি উপস্থিতি তারই প্রমাণ দেয়।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাহাড় থেকে নেমে আসা বিশাল ধ্বংসাবশেষ প্রধান রাস্তাগুলো অবরুদ্ধ করে রাখায় বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত চীনা উদ্ধারকারী দলগুলো সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জিরং সীমান্ত ক্রসিং পয়েন্টে পৌঁছাতে হিমশিম খাচ্ছিলো। বুধবারে ধারণ করা নাটকীয় ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, কাদামাটি ও ধ্বংসাবশেষের উপচে পড়া স্রোত কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সীমান্ত এলাকার সুউচ্চ স্থাপনাগুলোকে তছনছ করে দিচ্ছে এবং প্রাণ বাঁচাতে পালানোর চেষ্টা করা মানুষদের গিলে খাচ্ছে। তিব্বতের জিরং কাউন্টিতে এখন পর্যন্ত ২৬০ জন বিদেশিসহ মোট ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে সিসিটিভি।

স্বজন হারানোদের হাহাকার ও হৃদয়বিদারক দৃশ্য

অন্যদিকে নেপালের পার্বত্য এলাকায় সামরিক হেলিকপ্টার ব্যবহার করে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া হাজার হাজার মানুষের কাছে জরুরি ত্রাণ পৌঁছানো হচ্ছে। দুর্ঘটনাস্থল ও নিম্নাঞ্চলের সমতল এলাকায় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে ধ্বংসস্তূপ ও নদীর কাদা থেকে একের পর এক মৃতদেহ উদ্ধার করছেন জরুরি সেবা কর্মীরা।

রাসুয়া জেলা থেকে আকাশপথে উদ্ধার করে নুয়াকোটের সেনা ক্যাম্পে নিয়ে আসা দিবগা তামাং নামের এক ভাগ্যাহত ব্যক্তি কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, আমাদের আর কেউ বেঁচে নেই, সবাই মারা গেছে। এখন আর কারও জন্য অপেক্ষা করার মতো কেউ নেই। সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।

নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজে শত শত মানুষ স্থানীয় সেনা ঘাঁটি ও উদ্ধার কেন্দ্রগুলোতে ভিড় জমাচ্ছেন। সেনা ব্যারাকের বাইরে টানিয়ে দেওয়া উদ্ধার হওয়া জীবিত ও শনাক্ত হওয়া নিহতদের তালিকা দেখে স্বজনদের হাহাকার করতে দেখা গেছে।

বিপর্যয়ের ঢেউ পৌঁছে গেছে সুদূর যুক্তরাষ্ট্রেও। তিব্বতের কৈলাস পর্বতে ট্রেকিং করতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়া বহু আমেরিকানদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ভার্জিনিয়ার ১০ জন পুরুষ নাগরিক। তাদের একজন স্নেহা সুধীর অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে কান্না চেপে বলেন, ওরা কোথায় আছে আমরা জানি না। আমরা সবাই একে অপরের পাশে থেকে মার্কিন ও ভারতীয় কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে দিনরাত যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছি।

পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এরকম দৃশ্য আগে কেউ দেখেনি, যেখানে অত্যন্ত মজবুত ও শক্ত ভবনগুলো কাঠির মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এটা অত্যন্ত ভয়ংকর একটি ঘটনা। আমরা নেপালের নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাদের জানিয়েছি যে সাহায্য হিসেবে তারা যা চাইবে, তাই দেওয়া হবে।

বিদেশি উদ্ধার দল ফেরাল নেপাল

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ত্রাণ ও সরাসরি উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়ার প্রস্তাব দিলেও নেপাল স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, আপাতত তাদের দেশে কোনো বিদেশি অনুসন্ধান বা উদ্ধারকারী দল প্রবেশের প্রয়োজন নেই।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র উল্লেখ করে ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ জানিয়েছে—ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ তাদের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী দল নেপালে পাঠানোর অনুমতি চেয়ে অনুরোধ করেছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার একটি দ্রুত সাড়াদানকারী উদ্ধারকারী দল ইতিমধ্যে কাঠমান্ডুতে পৌঁছালেও নেপাল সরকারের ছাড়পত্র না পাওয়ায় তারা অভিযানে নামতে পারেনি।

নেপাল সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দেশটির নিজস্ব সেনাবাহিনী, পুলিশ ও নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে উদ্ধার কাজ চালাচ্ছে, তাই এই মুহূর্তে অন্য কোনো দেশের ফোর্সের হস্তক্ষেপ দরকার নেই।