নেপাল-চীন সীমান্তে ভূমিধসের ফলে সৃষ্ট একটি হ্রদ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) উপচে পড়তে শুরু করেছে। নতুন করে এই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় দুই দিন আগের আকস্মিক বন্যায় বিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উদ্ধারকাজ কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। খবর রয়টার্সের।
হিমবাহ ধসের কারণে সৃষ্ট গত বুধবারের (২৬ আগস্ট) ভয়াবহ বন্যায় নেপালে ৪৮৯ জন এবং চীনের তিব্বতে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। দুই দেশ মিলিয়ে এখনও প্রায় এক হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

ভূমিধসের পর হিমালয়ের পার্বত্য নদী ব্যবস্থা দিয়ে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের এক বিশাল স্রোত বয়ে যায়। এর ফলে নদীর গতিপথে একটি কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি হয় এবং সেখানে দ্রুত পানি জমতে থাকে। নেপালের কর্তৃপক্ষ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, শুক্রবার হ্রদটির জলাধারে পানির পরিমাণ ২৫ লাখ ঘনমিটার ছাড়িয়ে যায়, যা আগের দিন ছিলো আনুমানিক ১৫-২০ লাখ ঘনমিটার। শেষ পর্যন্ত পানি উপচে ভটেকোশি নদীতে মিশতে শুরু করে।
নেপালের বন্যা-বিধ্বস্ত রাসুয়া জেলার শীর্ষ কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার রয়টার্সকে বলেন, আমরা হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার একটি বিজ্ঞপ্তি পেয়েছি। তবে এটি কতোটা বডড়ো এবং এর জলস্তর কতোটা উঁচু, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। আমরা দেখতে পাচ্ছি নদীতে পানির স্তর ক্রমাগত বাড়ছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নদী থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্কতামূলক সাইরেন বাজানো হলে লোকজনকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে উঁচু জায়গায় ছুটতে দেখা যায়। উদ্ধারকর্মীদেরও তাদের সরঞ্জামসহ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

এ সময় এলাকা ছেড়ে পালানোর স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে ৪০ বছর বয়সী স্থানীয় বাসিন্দা শান্তি তামাং বলেন, ‘সবাই ‘দৌড়াও’ বলতে শুরু করায় আমিও দৌড়াই। বিদুর শহরের সাইরেন বেজে উঠলে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
শি জিনপিংয়ের নির্দেশ ও চীনের উদ্যোগ
হ্রদ উপচে পড়ার আশঙ্কায় চীনের উদ্ধারকর্মী ও যানবাহনগুলোকেও নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে অপেক্ষা করতে বলা হয়েছিল বলে জানায় রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যম সিসিটিভি। পরে উজানের বাঁধ দেওয়া হ্রদের ঝুঁকিটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য মনে হলে উদ্ধার অভিযান আবার শুরু করা হয়। নেপালও প্রায় ৯০ মিনিট বন্ধ রাখার পর তল্লাশি অভিযান পুনরায় চালু করেছে।
এদিকে বেইজিংয়ে চীনের পলিটব্যুরো শুক্রবার উদ্ধারকাজের গতি বাড়াতে বিশেষ বৈঠকে বসে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বেইজিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৈজ্ঞানিকভাবে অনুসন্ধান পরিকল্পনা প্রণয়ন করে চীন ও দেশের বাইরের নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালাতে হবে। একই সঙ্গে হিমবাহ হ্রদ ও ভূমিধসের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জোরালো নজরদারি এবং আন্তর্জাতিক দুর্যোগ সহযোগিতা বৃদ্ধির আহবান জানানো হয়।
দুর্যোগের গুরুত্ব বিবেচনায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং বৃহস্পতিবার বিকেলে তিব্বতের মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত জিরং কাউন্টিতে পৌঁছান, যা বেইজিং সরকারের সর্বোচ্চ জাতীয় অগ্রাধিকারের বিষয়টি স্পষ্ট করে। সেখানে অন্তত ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

নিখোঁজ সাড়ে পাঁচ শতাধিক বিদেশি, তীর্থযাত্রীদের খোঁজে হাহাকার
বুধবারের বন্যায় কাঠমান্ডুকে তিব্বতের লাসার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য ও পর্যটন পথের গ্রাম, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রাস্তা ও সেতু পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। নিখোঁজদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি রয়েছেন। তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ ভারত থেকে যাওয়া হিন্দু তীর্থযাত্রী, যারা তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর হ্রদের দিকে যাচ্ছিলেন। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা ১০ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিকও রয়েছেন, যাদের কোনো সন্ধান মিলছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, কাঠির মতো শক্ত ভবন ভেসে যাওয়ার এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে তাঁরা নেপালকে সর্বাত্মক সহায়তার প্রস্তাব পাঠিয়েছেন।

বিদেশি উদ্ধারকারী দল নিতে অস্বীকৃতি নেপালের
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দেশ সহযোগিতার হাত বাড়ালেও নেপাল সরকার জানিয়েছে, এই মুহূর্তে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযানে অন্য কোনো দেশের সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লোক বাহাদুর ছেত্রী শুক্রবার বলেন, আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তা সংস্থাগুলো অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান ভালোভাবে চালাচ্ছে। আপাতত বিদেশি টিমের সাহায্যের প্রয়োজন দেখছি না। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ ইতিমধ্যে নিজেদের উদ্ধারকারী দল পাঠানোর আবেদন জানিয়েছে। সিউলের একটি দ্রুত প্রতিক্রিয়া দল কাঠমান্ডুতে অবস্থান করলেও নেপাল সরকারের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে।
অন্য দিকে রাসুয়া ও নুয়াকোটের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বেঁচে ফেরা ক্ষতিগ্রস্তরা স্বজনদের হারিয়ে চরম শোকে দিন কাটাচ্ছেন। হেলিকপটারে উদ্ধার হওয়া দিবগা তামাং নামের এক আফসোস করে বলেন, আমাদের সব লোক মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ বেঁচে নেই। সবকিছু শেষ।
