মরক্কোতে মৃত্যু মিছিল দীর্ঘ হওয়ার সাথে সাথে বাড়ছে ক্ষোভ। দেশটির নাগরিকদের অভিযোগ, ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেকেই চাপা পড়ে আছেন, তাদের উদ্ধারে নেই তেমন কোনো উদ্যোগ। অধিকাংশ অঞ্চলে ভেঙে পড়েছে যোগযোগ ব্যবস্থা। বিদ্যুৎ না থাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে।
এক প্রতিবেদনে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, ভূমিকম্পে বাড়িঘর হারিয়ে অনেকেই টানা তৃতীয় দিনের মতো খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছেন। অনেক এলাকায় ওষুধ ও খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
ছয় দশকের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ভূমিকম্পে দেশটির আল-হাউজ, মারাকেশ, কোয়ারজাজাতে, আজিলাল, চিচাওয়া ও টারোডেন্ট এলাকা রীতিমতো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে পর্যটন নগরী মারাকেশ। এ শহরের অধিকাংশ ভবন পুরোনো এবং জাতিসংঘ ঘোষিত একাধিক বিশ্ব ঐতিহ্যের নিদর্শন রয়েছে। ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে সেখানকার অসংখ্য বাড়িঘর ধসে পড়েছে। এসব এলাকায় এখনও পৌঁছাতে পারেনি উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা।
মারাকেশের দক্ষিণে প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামে উদ্ধারকারীরা শুক্রবার রাতের মারাত্মক ভূমিকম্পের পর বেঁচে যাওয়া বাসিন্দাদের খুঁজে বের করার জন্য রীতিমতো লড়াই করছে।
মারাকেশ থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার (৩০ মাইল) দূরের আসনি এলাকার বাসিন্দারা বলছেন, তাদের জরুরি সহায়তা প্রয়োজন।
এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের কাছে খাবার নেই, রুটি বা শাকসবজি নেই। আমাদের কিছুই নেই।
তিনি আরও বলেন, আমাদের কাছে কেউ আসেনি। আমাদের আছে শুধু ঈশ্বর এবং রাজা।
মারাকেশের এক হাসপাতালে কর্মী মানেল বিবিসিকে জানান, ভূমিকম্পে তিনি তার ১০ আত্মীয়কে হারিয়েছেন। যারা শহরের বাইরের গ্রামে বসবাস করতেন।
তিনি বলেন, আমরা এখন থেকে কিছু করতে পারছি না। আমার আত্মীয়দের সাহায্য করতে চেয়েছিলাম কিন্তু রাস্তা বন্ধ থাকায় আমরা সেখানে যেতে পারছি না।
'কর্তৃপক্ষের উচিত রাস্তাগুলো খুলে দেয়া, যাতে আমরা সেখানে যেতে পারি।'
তিনি আরও বলেন, আপাতত আমাদের কাছে কোনো তথ্য নেই, কারণ ইন্টারনেট পরিষেবা এবং যোগাযোগের সব রাস্তা বন্ধ।
পরিস্থিতি খুবই কঠিন উল্লেখ করে মানেল বলেন, কিন্তু আমরা একটা সমাধান বের করার চেষ্টা করছি। মরক্কোর নাগরিক হিসেবে আমরা আমাদের ভাইদের এবং আহত বা নিহতদের পরিবারকে সাহায্য করতে চাই।
মারাকেশের কাছের আরেকটি ছোট্ট গ্রাম তাফেঘাঘেতে। ভূমিকম্পে গ্রামটি প্রায় সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। মারা গেছেন প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা।
স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, এই গ্রামের মানুষ হয় হাসপাতালে অথবা মৃত।
তাফেঘাঘেতের আরেক বাসিন্দা আবদু রহমান জানান, তিনি তার স্ত্রী এবং তিন ছেলেকে হারিয়েছেন। কিন্তু সে অর্থে কোনো সহায়তা পাননি।
কর্তৃপক্ষ বলছে, উদ্ধারকর্মীরা এখনও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে প্রতি মুহূর্তে আটকে পড়াদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা কমে আসছে।
এরইমধ্যে স্পেন, যুক্তরাজ্য, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাহায্যের প্রস্তাব গ্রহণ করেছে মরক্কো। ফ্রান্স, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং আরও কয়েকটি দেশ বলেছে যে তারাও সাহায্য করতে প্রস্তুত।
স্পেন দুটি দলে ৮৬ জন বিশেষজ্ঞ উদ্ধারকারী পাঠিয়েছে, যার প্রত্যেকটিতে চারটি স্নিফার কুকুর রয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার একটি ছোট মেডিকেল টিমসহ দুটি বিমানে চারটি কুকুরসহ ৬০ জন উদ্ধারকর্মীকে পাঠাচ্ছে। সাথে রয়েছে সিসমিক লিসেনিং ডিভাইস এবং কংক্রিট কাটার সরঞ্জাম।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্বীকার মরক্কো সরকার জানিয়েছে, তারা সাহায্যের প্রস্তাবগুলো যত্নসহকারে মূল্যায়ন করছে, কারণ "সমন্বয়ের অভাব বিপরীতমুখী হতে পারে"।
এর আগে স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ১১টার দিকে মরক্কোর পশ্চিমাঞ্চলে ৬ দশমিক ৮ ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।
মরক্কোর ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের অ্যাটলাস পর্বতমালা ঘেঁষা প্রদেশ আল হাউজের পার্বত্য শহর ইঘিলে, ভূপৃষ্ঠ থেকে ১৮ দশমিক ৫ মিটার গভীরে।
দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভূমিকম্পের পর থেকে এ পর্যন্ত দুই হাজার ১২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে আহত দুই হাজারের মধ্যে ১৪০০ জনেরও বেশি মানুষের অবস্থা গুরুতর।
ভূমিকম্পে হতাহতের ঘটনায় রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ দেশটিতে তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছেন।