কীভাবে এল মেঞ্চোকে জালে তুলল মেক্সিকোর সেনাবাহিনী?

মেক্সিকো সরকার জানিয়েছে, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির সবচেয়ে মোস্ট ওয়ান্টেড কার্টেল প্রধানকে নির্মূল করেছে। এই ঘটনার পর বেশ কয়েকটি রাজ্যে ব্যাপক সহিংসতার ছড়িয়ে পড়েছে; কার্টেল সদস্যরা তাদের শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করছে। নেমেসিও ওসেগুয়েরা রুবেন সেরভান্তেস, যিনি ‘এল মেঞ্চো’ নামে পরিচিত ছিলেন, মেক্সিকোর অন্যতম শক্তিশালী ‘জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল’ (সিজেএনজি)-এর নেতা ছিলেন। তাকে দেশটির অন্যতম সহিংস অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হতো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার মাথার ওপর ১ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবাম এই সামরিক অভিযানের প্রশংসা করেছেন এবং জনগণকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি লেখেন, সবগুলো রাজ্য সরকারের সঙ্গে আমাদের পূর্ণ সমন্বয় রয়েছে। দেশের বিশাল অংশে স্বাভাবিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

ছবি: সংগৃহীত
যেভাবে নিহত হলেন এল মেঞ্চো

মেক্সিকোর জাতীয় প্রতিরক্ষা সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপকূলীয় রাজ্য জালিস্কোর তাপালপা নামক একটি শহর থেকে মেঞ্চোকে ধরা হয়। এই রাজ্যেই তার কার্টেল প্রতিষ্ঠিত এবং এর মূল ঘাঁটি অবস্থিত। সেনাদের সাথে সংঘর্ষের সময় তিনি আহত হন এবং চিকিৎসার জন্য মেক্সিকো সিটিতে নেওয়ার পথে তার মৃত্যু হয়।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অভিযান চলার সময় সেনারা হামলার মুখে পড়ে এবং ঘটনাস্থলেই চারজনকে খতম করে। ওসেগুয়েরা সেরভান্তেসসহ আরও তিনজন আহত হন এবং পরে মারা যান। এছাড়া আরও দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং সাঁজোয়া যান, রকেট লঞ্চারসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে। অভিযানে সশস্ত্র বাহিনীর তিন সদস্য আহত হয়েছেন এবং তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, অভিযানে অন্তত আরও নয়জন কার্টেল সদস্য নিহত হয়েছে।

সেরভান্তেস দীর্ঘদিন ধরে গ্রেপ্তার এড়িয়ে আসছিলেন। জালিস্কোতে প্রায় অবাধে অপরাধ চালানোর জন্য তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে হাত করে রেখেছিলেন এবং রাজনৈতিক ছত্রছায়াও খুঁজতেন। ২০১৫ সালের মে মাসে মেক্সিকান বাহিনী যখন তাকে ঘিরে ফেলেছিল, তখন তার অনুসারীরা একটি রকেট-চালিত গ্রেনেড দিয়ে একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছিল, যাতে তাদের বস পালানোর সুযোগ পায়।

ড্রাগ কার্টেলগুলোর বিরুদ্ধে মেক্সিকোর সাম্প্রতিক অভিযানে সেরভান্তেসের মৃত্যু একটি বড় জয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সাফল্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপ কমাতে সাহায্য করতে পারে, যিনি মেক্সিকোতে হামলার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। মেক্সিকো সরকার জানিয়েছে, এই অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছে। তবে নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, এটি সম্পূর্ণ মেক্সিকোর নিজস্ব অপারেশন ছিল এবং এতে কোনো মার্কিন সেনা অংশ নেয়নি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিটও নিশ্চিত করেছেন যে মার্কিন সরকার এই অভিযানে গোয়েন্দা সহায়তা দিয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে ফেন্টানিল পাচারের অন্যতম হোতা হিসেবে ‘এল মেঞ্চো’ মেক্সিকো ও মার্কিন সরকারের জন্য একটি প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল। মার্কিন উপ-পররাষ্ট্র সচিব ক্রিস্টোফার ল্যান্ডউ এল মেঞ্চোকে অন্যতম রক্তপিপাসু ও নিষ্ঠুর মাদক সম্রাট হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, এটি মেক্সিকো, যুক্তরাষ্ট্র এবং সারা বিশ্বের জন্য একটি বিরাট সাফল্য।

ছবি: সংগৃহীত
মেক্সিকোজুড়ে পরবর্তী সহিংসতা

মাদক সম্রাটের মৃত্যুর পর কয়েক ঘণ্টা ধরে কার্টেল সদস্যরা যানবাহন জ্বালিয়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখে, যা সাধারণত সামরিক অভিযান বাধাগ্রস্ত করতে তারা ব্যবহার করে থাকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে জালিস্কোর পর্যটন শহর পুয়ের্তো ভাল্লার্থার আকাশে ধোঁয়া উড়তে দেখা গেছে এবং রাজ্যের রাজধানী গুয়াদালাহারার বিমানবন্দরে আতঙ্কিত মানুষকে দৌড়াতে দেখা গেছে। নিরাপত্তার কারণে বেশ কিছু মেক্সিকান এবং আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা পুয়ের্তো ভাল্লার্থায় ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করেছে।

গুয়াদালাহারায় জ্বলন্ত যানবাহন দিয়ে রাস্তা অবরোধ করা হয়েছে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ মাত্র কয়েক মাস পরেই মেক্সিকোর এই দ্বিতীয় বৃহত্তম শহরে ফুটবল বিশ্বকাপের ম্যাচ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বেশ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের জালিস্কো, তামাউলিপাস, মিচোয়াকান, গুয়েরেরো এবং নুয়েভো লিওন রাজ্যে নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। জালিস্কোর গভর্নর পাবলো লেমাস বাসিন্দাদের বাড়িতে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন এবং গণপরিবহন স্থগিত করে বলেছেন যে রাজ্যটি সংকটময় মুহূর্ত পার করছে।

মার্কিন চাপ এবং যৌথ সহায়তার অভিযান

এল মেঞ্চোকে গ্রেপ্তারে সহায়ক তথ্যের জন্য মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ১ কোটি ৫০ লক্ষ ডলার পুরস্কারের প্রস্তাব দিয়েছিল। ২০০৯ সালের দিকে যাত্রা শুরু করা জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল মেক্সিকোর অন্যতম শক্তিশালী ও দ্রুত বর্ধনশীল অপরাধী সংগঠন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প প্রশাসন এই কার্টেলকে একটি বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করে।

প্রেসিডেন্ট শিনবাম এর আগে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর ‘কিংপিন স্ট্র্যাটেজি’ বা মূল নেতাকে খতম করার নীতির সমালোচনা করেছিলেন। কারণ তার মতে, শীর্ষ নেতাকে সরিয়ে দিলে কার্টেলগুলো ভেঙে যায় এবং ব্যাপক সহিংসতার সূত্রপাত হয়। মেক্সিকোতে তিনি জনপ্রিয় হলেও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সবসময়ই ছিল। বিশেষ করে এক বছর আগে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকে মাদক পাচার দমনে ফলাফল দেখানোর জন্য শিনবাম প্রচণ্ড চাপের মধ্যে ছিলেন।

ছবি: সংগৃহীত
এল মেঞ্চো ও তার কার্টেল প্রসঙ্গ

জালিস্কো কার্টেল সামরিক বাহিনীর ওপর হামলা, যেমন হেলিকপ্টার ভূপাতিত করা এবং ড্রোন থেকে বিস্ফোরক ছোড়া বা মাইন স্থাপনের মতো কাজে পারদর্শী ছিল। ২০২০ সালে তারা মেক্সিকো সিটির প্রাণকেন্দ্রে তৎকালীন পুলিশ প্রধানের ওপর গ্রেনেড ও উচ্চ ক্ষমতার রাইফেল দিয়ে দুর্ধর্ষ হামলা চালিয়েছিল।

মার্কিন মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ডিইএ’র মতে, এই কার্টেল সিনালোয়া কার্টেলের মতোই শক্তিশালী এবং যুক্তরাষ্ট্রের ৫০টি রাজ্যেই এদের উপস্থিতি রয়েছে। সিনালোয়া কার্টেল তাদের নেতা ‘এল মায়ো’ জাম্বাদা এবং ‘এল চাপো’ গুজমান মার্কিন হেফাজতে যাওয়ার পর অন্তর্কন্দলে দুর্বল হয়ে পড়লেও জালিস্কো কার্টেল ফেন্টানিল এবং মেথামফেটামিন উৎপাদন করে বিলিয়ন ডলার আয় করে চলেছে।

৫৯ বছর বয়সী ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস মূলত মিচোয়াকান রাজ্যের আগুইলিলা শহরের বাসিন্দা ছিলেন। নব্বইয়ের দশক থেকেই তিনি মাদক পাচারে যুক্ত হন। যুবক বয়সে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান এবং ১৯৯৪ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় হেরোইন পাচারের ষড়যন্ত্রে দোষী সাব্যস্ত হয়ে প্রায় তিন বছর জেল খাটেন।

মুক্তি পাওয়ার পর তিনি মেক্সিকোতে ফিরে আসেন এবং মাদক সম্রাট নাচো করোনেলের সঙ্গে মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। করোনেলের মৃত্যুর পর সেরভান্তেস এবং এরিক ভ্যালেন্সিয়া সালাজার মিলে ২০০৭ সালের দিকে জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল গঠন করেন। শুরুতে তারা সিনালোয়া কার্টেলের হয়ে কাজ করলেও পরে আলাদা হয়ে যায় এবং বহু বছর ধরে দুই কার্টেলের মধ্যে আধিপত্যের লড়াই চলে আসছিল।