এল মেঞ্চো: কৃষক থেকে যেভাবে হয়ে উঠলেন মেক্সিকোর ত্রাস

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম

মেক্সিকোর সংগঠিত অপরাধ জগতের ইতিহাসে যে অল্প ক’জন ব্যক্তির নাম স্থায়ী প্রভাব ফেলেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস, যিনি ‘এল মেঞ্চো’ নামেই বেশি পরিচিত। তার সম্পর্কে খুব অল্প তথ্যই রয়েছে মেক্সিকো ও আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে। তবে এল মেঞ্চোর তৈরি মাদক চক্র যে মেক্সিকোর সবচেয়ে বড় এবং দুর্ধর্ষ অপরাধী সংগঠন সে বিষয়ে দ্বিমত নেই কারো।

মেক্সিকোর পশ্চিমের মিচোয়াকান রাজ্যের এক সাধারণ গ্রামীণ পটভূমি থেকে উঠে এসে, দেশটির অন্যতম ত্রাস এবং বিপজ্জনক গোষ্ঠী 'জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল' (সিজেএনজি)-এর শীর্ষস্থানে নেমেসিও ওসেগুয়েরা সেরভান্তেস ওরফে এল মেঞ্চোর আরোহণ ছিল উল্কাবেগের মতো। আর এই সাফল্য তিনি অর্জন করেছিলেন চরম আগ্রাসন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পাশবিকতা এবং নির্মমতার মাধ্যমে।

ছবি: সংগৃহীত
এল মেঞ্চো ও তার অপরাধচক্রের সাত শীর্ষ সদস্যের মৃত্যু মেক্সিকো এবং যুক্তরাষ্ট্র, উভয় দেশের জন্যই একটি বড় বিজয় হিসেবে উদযাপিত হচ্ছে। মেক্সিকান ও মার্কিন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই মাদক সম্রাটকে নির্মূল করার অভিযানে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যুক্ত ছিল। এটি দুই দেশের সীমান্ত-অতিক্রমী সহযোগিতার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, যা উভয় সরকারের জন্যই লাভজনক হতে পারে।

মেক্সিকান সামরিক বাহিনীর জন্য এর অর্থ হলো, সমীকরণ থেকে একজন বড় কার্টেল নেতাকে সরিয়ে দেয়া, যার ফলে তাত্ত্বিকভাবে হলেও তাঁর পরিচালিত অপরাধী গোষ্ঠীটি অন্তত কিছু সময়ের জন্য দুর্বল হয়ে পড়বে। তবে এল মেঞ্চোর অনুসারীদের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক ও তীব্র। প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের গুয়েরো থেকে উত্তর-পূর্বের তামাউলিপাস পর্যন্ত অন্তত আটটি রাজ্যে রাস্তা অবরোধ ও ব্যাপক সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি রাজধানী মেক্সিকো সিটি এবং পাশের মেক্সিকো স্টেটও এই তাণ্ডব থেকে রেহাই পায়নি।

ছবি: সংগৃহীত
সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতা দেখা গেছে খোদ জালিস্কো রাজ্যে। রাজ্যের রাজধানী গুয়াদালাহারা, যা আসন্ন ফিফা বিশ্বকাপের অন্যতম ভেন্যু, সেখানে মুখোশধারী বন্দুকধারীরা বিভিন্ন দোকানে অগ্নিসংযোগ করেছে। অন্যদিকে, পর্যটন কেন্দ্র পুয়ের্তো ভাল্লর্তায় এই সহিংসতার ঢেউ না কমা পর্যন্ত পর্যটক ও স্থানীয়রা নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করছেন। এটি এল মেঞ্চোর সাধারণ সদস্যদের পক্ষ থেকে তাদের নেতার প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ এবং তাঁকে সরিয়ে দেয়ার প্রতিবাদে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এক চরম ক্ষোভের প্রদর্শন।

তবে এই রাস্তা অবরোধ এবং গাড়ি পোড়ানোর ঘটনাগুলো শুধু সাময়িক শক্তির মহড়া নাকি সহিংসতা আরও চরম রূপ নেবে, তা আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হবে। এ ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরবর্তী পদক্ষেপ হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি একটি চিরন্তন সত্য, এল মেঞ্চোর মতো প্রভাবশালী নেতার পতনের পর তাঁর স্থলাভিষিক্ত হওয়ার জন্য তিন-চারজন দক্ষ সহযোগী সব সময়ই প্রস্তুত থাকে।

ছবি; সংগৃহীত
তা সত্ত্বেও, এই গোষ্ঠীর উত্থানের নেপথ্যে এল মেঞ্চো ছিলেন মূল কারিগর। আশির দশকে যখন তিনি একজন অবৈধ অভিবাসী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, তার আগেই নিজের জন্মভূমিতে মারিজুয়ানা চাষের মাধ্যমে অপরাধ জগতে তার হাতেখড়ি হয়েছিল। ক্যালিফোর্নিয়াতে মাদক সংক্রান্ত অপরাধে জড়িয়ে তিনি বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হন এবং শেষ পর্যন্ত কয়েক বছর জেলও খাটেন।

৩০ বছর বয়সে মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানোর পর তিনি পুরোপুরি কার্টেল কার্যক্রমে নিমগ্ন হন। মিচোয়াকান ভিত্তিক 'মিলেনিও কার্টেল'-এর হয়ে কাজ করার সময় একজন হিসেবী ও নিষ্ঠুর বস হিসেবে তাঁর খ্যাতি বাড়তে থাকে। যখন সেই কার্টেলটি ভেঙে টুকরো হয়ে যায়, তখন এল মেঞ্চো সেই ধ্বংসাবশেষ থেকেই ‘সিজেএনজি’ (সিজেএনজি) গড়ে তোলেন এবং এর প্রধান হয়ে বসেন।

এল মেঞ্চোর স্ত্রী রোজালিন্ডাও ছিলেন অপরাধী চক্রের অন্যতম শীর্ষ নেতা                                                 ছবি: সংগৃহীত
কৌশলী রাজ্যবিস্তার এবং মাদক কারবারের পাশাপাশি অন্যান্য লাভজনক অবৈধ পথে দ্রুত পা রাখার দক্ষতার কারণে তিনি এই গোষ্ঠীকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন, যা বর্তমানে মেক্সিকোর প্রধান অপরাধী শক্তি। তার এই উত্থানের পেছনে 'সিনালোয়া কার্টেল'-এর পতনও বড় ভূমিকা রেখেছে।

সিনালোয়া প্রধান জোয়াকিন ‘এল চাপো’ গুজমানকে যুক্তরাষ্ট্রে হস্তান্তরের পর অন্তর্কন্দলে সেই গোষ্ঠীটি দুর্বল হয়ে পড়ে। এল চাপোর ছেলেদের পতনের পর ফেন্টানিল বাণিজ্যের একটি বড় অংশ সিজেএনজির দখলে চলে আসে। এল চাপোর এক ছেলে জোয়াকিন গুজমান লোপেজ মার্কিন কর্তৃপক্ষের কাছে আত্মসমর্পণ করার সময় তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইসমাইল ‘এল মায়ো’ জাম্বাদাকেও সাথে নিয়ে ডোবেন। সিনালোয়াতে তৈরি হওয়া এই শূন্যতার সরাসরি সুফলভোগী ছিলেন এল মেঞ্চো। কিন্তু মেক্সিকোর মাদক জগতের নিষ্ঠুর নিয়ম অনুযায়ী, এই মুকুট তিনি খুব বেশিদিন মাথায় রাখতে পারলেন না।

ছবি: সংগৃহীত
প্রেসিডেন্ট ক্লডিয়া শিনবামের সরকার এই মোস্ট ওয়ান্টেড অপরাধীর মৃত্যুকে একটি বিশাল সাফল্য হিসেবে তুলে ধরবে এবং ওয়াশিংটনও একই সুরে কথা বলবে। এটি অভিবাসনের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান দাবি, অর্থাৎ ফেন্টানিল পাচার রোধে মেক্সিকোর অগ্রগতির প্রমাণ দেয়।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার সরাসরি সম্পৃক্ততা এটাই প্রমাণ করে যে, শিনবাম প্রশাসন অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে ওয়াশিংটনের সাথে কাজ করতে কতটা আগ্রহী। তিনি হয়তো আশা করছেন, এই সহযোগিতা মেক্সিকোর মাটিতে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা সামরিক পদক্ষেপ বা ড্রোন হামলার আলোচনাকে থামিয়ে দেবে, রিপাবলিকান পার্টি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের কেউ কেউ যা নিয়মিত দাবি করে আসছিলেন।

 
এমন অনেক আলোচনা হয়তো ভবিষ্যতে হবে। তবে আপাতত মেক্সিকানরা এল মেঞ্চোর মৃত্যুর খবরটি হজম করার চেষ্টা করছে এবং তার অনুপস্থিতিতে কার্টেল সদস্যদের রাজপথে আগুন দেয়ার দৃশ্য আতঙ্কিত চোখে দেখছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে এল মেঞ্চোকে তৈরি হবে হলিউডের ব্লকবাস্টার থ্রিলার।

এআরএস
ভয়াবহ ও জীবননাশী শক্তি নিয়ে মেক্সিকোর বাহা ক্যালিফোর্নিয়া সুর উপদ্বীপের দিকে ধেয়ে আসছে ক্যাটাগরি-৩ মাত্রার শক্তিশালী হারিকেন 'পোলো'। সোমবার যে কোনো মুহূর্তে উপকূলে আছড়ে পড়ার আশঙ্কায় স্থানীয়...
মেক্সিকো সরকার জানিয়েছে, তাদের নিরাপত্তা বাহিনী দেশটির সবচেয়ে মোস্ট ওয়ান্টেড কার্টেল প্রধানকে নির্মূল করেছে। এই ঘটনার পর বেশ কয়েকটি রাজ্যে ব্যাপক সহিংসতার ছড়িয়ে পড়েছে; কার্টেল সদস্যরা তাদের...
মেক্সিকোর শক্তিশালী ও দুর্ধর্ষ 'জালিস্কো নিউ জেনারেশন কার্টেল' (সিজেএনজি) প্রধান নেমেসিও ‘এল মেঞ্চো’ ওসেগুয়েরা সেরভান্তেসকে নির্মূল করার অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছে বলে...
আমেরিকার প্রতিবেশী ও এবারের বিশ্বকাপ ফুটবলের অন্যতম আয়োজক মেক্সিকোতে দুর্ধর্ষ এক মাদক চক্র ও অপরাধী গোষ্ঠির প্রধানসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দেশটি জেড়ে রীতিমতো নরক গুলজার চলছে।...
শারদীয় দুর্গোৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হলো গভীর শোকে। ভারতের কলকাতার একটি জনপ্রিয় পূজামণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় ও বৃষ্টির জেরে সৃষ্ট পদদলনে ঘটনায় অন্তত ১৭ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আহত...
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী পাটোয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন এলাকায় কাঠের তৈরি তিনতলা টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্তোরাঁয় সংঘটিত ভয়াবহ আগুনে ১০ জন পর্যটকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় চাঞ্চল্যকর সব তথ্য সামনে এসেছে।...
সৌদি আরবের বিমানবন্দরে আকস্মিক হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথে শুরু হয়েছে চরম চাঞ্চল্য ও অস্থিরতা! পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে রিয়াদগামী নিজেদের সব উড্ডয়ন বা ফ্লাইট এক ধাক্কায় অনির্দিষ্টকালের...
সুদূর চীনের হেনান শহর থেকে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে সোজা বাংলাদেশের মাদারীপুর সদর উপজেলার চাপাতলী গ্রামে হাজির হয়েছেন ওয়াং এরলিং নামের এক চীনা যুবক। উদ্দেশ্য একটাই, মন দেয়া-নেয়া হওয়া মাদারীপুরের...
লোডিং...
সর্বশেষপঠিত

এলাকার খবর