ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধে টালমাটাল বিশ্ব ভূ-রাজনীতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রই নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী আমেরিকার দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক মিত্রতাকেও খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। জার্মানি থেকে সেনা প্রত্যাহার, ন্যাটোকে অব্যাহত হুমকি এবং উপসাগরীয় মিত্রদের ওপর ইরানি হামলাকে গুরুত্ব না দেয়া, এই সব কিছুই আমেরিকার দীর্ঘদিনের বন্ধুদের মনে এক গভীর আস্থার সংকট তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ১০ সপ্তাহের এই যুদ্ধের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব হতে পারে বিশ্বমঞ্চে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা হারানো।

ইরান যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও ন্যাটোর সঙ্গে ট্রাম্পের সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম আকার ধারণ করেছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইরানে বিমান হামলার যে সিদ্ধান্ত ট্রাম্প নেন, তাতে ইউরোপীয় দেশগুলো তার ঘোর আপত্তি ছিল। কারণ, এই যুদ্ধে হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে নজিরবিহীন জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, তার প্রধান অর্থনৈতিক শিকার হয়েছে ইউরোপ।

এই তিক্ততা আরও বৃদ্ধি পায় যখন জার্মান চ্যান্সেলর মন্তব্য করেন, ইরান আমেরিকাকে অপমান করছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প জার্মানি থেকে পাঁচ হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন এবং টমাহক ক্রুজ মিসাইল মোতায়েনের পরিকল্পনা বাতিল করেন। এমনকি ইতালি ও স্পেন থেকেও সেনা কমানোর হুমকি দিয়েছেন তিনি, যা ন্যাটোর সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।


ব্রিটিশ ও অন্যান্য মিত্রদের ওপর চাপ:
ট্রাম্প শুধু জার্মানি নয়, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারকেও কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন। গত মার্চে তিনি স্টারমারকে উপহাস করে বলেন, তিনি ‘উইনস্টন চার্চিল নন’ এবং যুক্তরাজ্যের ওপর ভারী শুল্ক আরোপের হুমকি দেন। এছাড়া স্পেনের সদস্যপদ স্থগিত করা এবং ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের ওপর ব্রিটেনের দাবি পুনর্বিবেচনার মতো চরম হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ট্রাম্পের পেন্টাগন।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি এই অবস্থানকে সমর্থন করে বলেছেন, ট্রাম্প তথাকথিত মিত্রদের দ্বারা আমেরিকাকে আর ব্যবহৃত হতে দেবেন না। অন্যদিকে, ইউরোপীয় দেশগুলো এখন আমেরিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকছে, যদিও এই রূপান্তর সময়সাপেক্ষ।


মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ার উদ্বেগ:
উপসাগরীয় দেশগুলো, যারা দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকার নিরাপত্তার ওপর ভরসা করে আসছিল, তারা এখন চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছে। গত সপ্তাহে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরা বন্দরে ইরানের মিসাইল ও ড্রোন হামলার ঘটনাকে ট্রাম্প ‘সামান্য ঘটনা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। ট্রাম্পের এই উদাসীনতা আরব মিত্রদের মনে এই ভয় জাগিয়ে তুলেছে যে, আমেরিকা হয়তো তাদের বিপদে ফেলে ইরানের সঙ্গে কোনো গোপন চুক্তিতে চলে যাবে।

এশিয়ায় জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াও একই রকম দুশ্চিন্তায় ভুগছে। তেলের জন্য হরমুজের ওপর নির্ভরশীল এই দেশগুলো দেখছে, আমেরিকা তার মিত্রদের স্বার্থের চেয়ে নিজের অভ্যন্তরীণ তেলের দাম নিয়ন্ত্রণকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। জাপানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকেশি ইওয়ায়া রয়টার্সকে বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো জাপানের প্রধান মিত্র আমেরিকার প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা ও প্রত্যাশা সংকুচিত হচ্ছে।


শত্রু শিবিরের কৌশলগত সুযোগ:
আমেরিকার এই অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিতে বসে নেই রাশিয়া ও চীন। জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে রাশিয়া এই যুদ্ধের ফলে চড়া তেলের বাজার থেকে লাভবান হচ্ছে। অন্যদিকে, চীন নিজেদের একটি ‘নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, ট্রাম্পের এই একতরফা শক্তি প্রদর্শনের নীতি রাশিয়া ও চীনকে তাদের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর (যেমন ইউক্রেন বা তাইওয়ান) আরও আগ্রাসী হতে উৎসাহিত করতে পারে।

সব মিলিয়ে, ২০২৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব ছাড়ার আগ পর্যন্ত ট্রাম্পের এই ‘অনির্দেশ্য’ বিদেশনীতি বিশ্ব ব্যবস্থাকে কোন দিকে নিয়ে যায়, তা নিয়ে গভীর সংশয়ে রয়েছে বিশ্বনেতারা। ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ হয়তো শেষ হবে, কিন্তু আমেরিকার দীর্ঘদিনের মিত্রদের সঙ্গে যে ফাটল ধরেছে, তা মেরামত করা আগামী প্রজন্মের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স