কলম্বিয়ায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা তিন অঙ্কে

কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলে সোমবার সকালে আঘাত হানা ভয়াবহ ৭.৪ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে অন্তত ১১১ জনে পৌঁছেছে। দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও ৮৭ জন এবং ধসে পড়া শত শত ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ আটকে আছেন। কলম্বিয়ান জিওলজিক্যাল সার্ভে জানিয়েছে, গত ১০ বছরের মধ্যে এটিই দেশটির ভূখণ্ডে রেকর্ড করা সবচেয়ে শক্তিশালী ভূকম্পন।

ইউএস জিওলজিক্যাল সার্ভে (ইউএসজিএস) এবং কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবার স্থানীয় সময় সকালে দেশের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলের কম জনবহুল চোকো প্রদেশের সান হোসে দেল পালমার পৌরসভার কাছে ভূগর্ভের ১০৭ কিলোমিটার গভীরে এই ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয়। রাজধানী বোগোতা থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে হলেও ভূমিকম্পটি দেশজুড়ে প্রচণ্ডভাবে অনুভূত হয় এবং ভেনিজুয়েলা, ইকুয়েডর ও পানামা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।

Colombia Earthquake 14
জরুরি অবস্থা জারি ও নতুন প্রেসিডেন্টের চ্যালেঞ্জ

মাত্র কয়েক দিন আগে শপথ নেওয়া কলম্বিয়ার নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলিয়ার্দো দে লা এস্পরিয়েলা এই মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে তাঁর শাসনের প্রথম বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হয়েছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন।

দুপুরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে প্রেসিডেন্ট বলেন, রাষ্ট্রের সমস্ত শক্তি ও সক্ষমতাকে কাজে লাগানো হয়েছে জীবন রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা এবং ত্রাণ পৌঁছানোর জন্য। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের জীবিত উদ্ধার করাই এখন আমাদের প্রথম ও প্রধান অগ্রাধিকার।

Colombia Earthquake 13
ধ্বংসযজ্ঞ ও বিভিন্ন শহরের সবশেষ পরিস্থিতি

ভূমিকম্পের ফলে দেশটির কফি উৎপাদনকারী অঞ্চল এবং বড় শহরগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

রিজারালদা: কফি বেল্ট অঞ্চলের এই প্রদেশে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। কেবল এই অঞ্চলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র পেরেইরা শহরেই ১৮ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। বহু ঘরবাড়ি ও ঐতিহ্যবাহী ভবনের দেয়াল ভেঙে পড়েছে।

ভ্যালে দেল কাউকা ও ক্যালি: এই বিভাগে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। ৩ লাখেরও বেশি মানুষের বসবাসরত বড় শহর ক্যালিতে অন্তত ২৫টি বহুতল ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।

মানিজালেস: এখানে ২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। শহরের ঐতিহাসিক 'মেট্রোপলিটন ব্যাসিলিকা ক্যাথেড্রাল অব আওয়ার লেডি অব দ্য রোজারি'-র একটি ঐতিহ্যবাহী টাওয়ার আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ভূকম্পন-সহনশীল কঠোর নিয়ম মেনে তৈরি করায় ১৭ তলার মতো উঁচু ভবনগুলো কেঁপে উঠলেও টিকে গেছে।

মেডেলিন: এ শহরের অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে সাইরেন বাজিয়ে বাসিন্দাদের রাতে পরা পোশাক বা তোয়ালে পেঁচানো অবস্থায় রাস্তায় নেমে আসতে দেখা যায়। বড় কোনো ভবন ধসে না পড়লেও মেট্রো রেল সেবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।

রাজধানী বোগোতা: বোগোতার মেয়র কার্লোস ফার্নান্দো গালান জানিয়েছেন, রাজধানীতে বড় ধরনের কোনো কাঠামোগত ক্ষতি বা প্রাণহানি হয়নি। ফলে বোগোতা তার নিজস্ব উদ্ধারকারী সংস্থানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত শহরগুলোতে পাঠাচ্ছে।

Colombia Earthquake 12
বিমানবন্দর বন্ধ ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা

দেশটির বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেরেইরা, মানিজালেস, আরমেনিয়া, কার্তাগো এবং বুয়েনাপেনতুরা, এই পাঁচটি বিমানবন্দর সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধ করে কেবল জরুরি চিকিৎসা ও সরকারি ত্রাণ বিমানের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। এছাড়া পোপায়ান বিমানবন্দরটি কাছে অবস্থিত পুরাসে আগ্নেয়গিরি থেকে ছাই নির্গত হওয়ার কারণে সেখানে ফ্লাইট ওঠানামা সীমিত করা হয়েছে।

জাতিসংঘের মুখপাত্র ফারহান হক নিউইয়র্কে এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, গ্রামীণ এলাকাগুলোতে যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। জাতিসংঘ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং যেকোনো সহায়তায় প্রস্তুত রয়েছে।

Colombia Earthquake 11
আন্তর্জাতিক সাহায্য ও সহযোগিতার প্রস্তাব

ভূমিকম্পের খবর পেয়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এল সালভাদরের প্রেসিডেন্ট নায়িব বুকেলে জরুরি ভিত্তিতে উদ্ধারকারী দল, চিকিৎসক ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল নোবোয়া ৪৭ জন বিশেষ উদ্ধারকর্মী, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ও যন্ত্রপাতি সহ একটি প্রতিনিধি দল পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবামও সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

পপ তারকা শাকিরা আবেগময় বার্তা

কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা সোশ্যাল মিডিয়া ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) দেশবাসীর উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, আজকে যারা এই ভূমিকম্পের ভয়াবহতা অনুভব করেছেন এবং যে পরিবারগুলো চরম উদ্বেগের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাদের জন্য আমার হৃদয় কাঁদছে। আমি আমার মাতৃভূমির জন্য ভালোবাসা ও শক্তি পাঠাচ্ছি। এমন কঠিন সময়ে আমরা কলম্বিয়ানরা জানি কীভাবে একে অপরের পাশে দাঁড়াতে হয়।

Colombia Earthquake 09
ভৌগোলিক অবস্থান ও 'রিং অব ফায়ার'

কলম্বিয়ার যে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভূমিকম্পটি আঘাত হেনেছে, তা মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের 'রিং অব ফায়ার' বা অগ্নিবলয় অঞ্চলে অবস্থিত। একাধিক টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত হওয়ায় দেশটি ভূমিকম্পপ্রবণ।

১৯৫০ সালের পর থেকে ভূমিকম্পে দেশটিতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর আগে ১৯৯৯ সালে ৬.২ মাত্রার এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে আরমেনিয়া ও পেরেইরা শহরে ১,১৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে, চলতি বছরের জুন মাসেই প্রতিবেশী ভেনিজুয়েলায় জোড়া ভূমিকম্পে ছয় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছিল, সেই স্মৃতি এখনও ওই অঞ্চলের মানুষের মনে তাজা।