প্যারাগুয়ে জুড়ে এখন তীব্র ক্ষোভ ও চরম অনিশ্চয়তা। দেশের অর্ধেকেরও বেশি মানুষ নিজেদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা থাকা সঞ্চয় তুলতে পারছেন না। এই নজিরবিহীন আর্থিক বিপর্যয় ও ব্যাংক ধসের জেরে ক্ষমতা হারাতে হলো পরাগুয়ের প্রেসিডেন্ট সান্টিয়াগো পেনিয়াকে। তাকে অভিশংসিত করার পর নিজ বাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছে।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে দেশটির ডিজিটাল ব্যাংক ‘উয়েনো ব্যাংক’ হঠাৎ ধসে পড়ে এবং পরাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এর নিয়ন্ত্রণ নেয়। অভিযোগ উঠেছে, এই ব্যাংকের সাথে সাবেক প্রেসিডেন্ট পেনিয়ার নিজস্ব ব্যবসা ও ব্যক্তিগত স্বার্থ জড়িত ছিলো। গত বছর পর্যন্ত তিনি এই ব্যাংকের মূল মালিকানা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারহোল্ডার ছিলেন।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বৃহস্পতিবার নিজেই পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছিলেন পেনিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, আপনাদের বিশ্বাসের মর্যাদা দেওয়া থেকে বিচ্যুত হওয়া আমার উদ্দেশ্য ছিল না। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যারা নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ জমা রেখেছেন, তাদের মানসিক শান্তিই এখন আমার প্রথম অগ্রাধিকার।
তবে আইনপ্রণেতারা তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করার বদলে অভিশংসনের পথ বেছে নেন। শুক্রবার দেশটির সেনেটে পেনিয়ার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রস্তাব আনা হলে ৪৫ জন সেনেটরের মধ্যে ৪৪ জনই তার বিপক্ষে ভোট দেন (একজন অনুপস্থিত ছিলেন)। আইনপ্রণেতারা সর্বসম্মতিক্রমে তাকে বরখাস্ত করেন এবং দায়িত্ব পালনে চরম অবহেলার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। বরখাস্ত হওয়ার সাথে সাথেই সাবেক প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি যে আইনি সুরক্ষামূলক পেতেন, তাও হারিয়েছেন।
এর কয়েক মিনিটের মাথায় তাকে গ্রেপ্তার করে গৃহবন্দী করা হয়। পেনিয়ার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বার্থের সংঘাত, রেগুলেটরি তদারকিতে কারচুপি, পেনশন তহবিল আত্মসাৎ এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাথে মিলে প্রাতিষ্ঠানিক তথ্য গোপনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
কৌঁসুলি সিলভিয়া মারগারিতা গঞ্জালেজ ভেস্টার জানিয়েছেন, বিশ্বাস ভঙ্গ, প্রভাব বিস্তার এবং অর্থ আত্মসাতের মতো মারাত্মক অভিযোগে পেনিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। বিষেশজ্ঞদের মতে, এই ব্যাংক ধসের জন্য তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে ফৌজদারি মামলা চলতে পারে।
তবে পেনিয়ার পক্ষে লড়াই করা আইনজীবী রিকার্ডো প্রেডা এসব অভিযোগকে দায়িত্বজ্ঞানহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও দায়িত্বহীন অভিযোগ বলে দাবি করেছেন এবং পেনি নিজেও কোনো ধরনের অন্যায়ের কথা অস্বীকার করেছেন।
এদিকে, এই ঘটনার পর দেশের নতুন অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট পেদ্রো আলিয়ানা। তিনি ২০২৮ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। জনগণের উদ্দেশে আলিয়ানা প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, আর্থিক ধসের কারণে আমাদের যে দেশবাসীরা চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন, তাদের এই অবস্থায় ছেড়ে দেওয়া হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত সবাইকে পূর্ণ ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে।
পরাগুয়ে জুড়ে তীব্র জনরোষ: উয়েনো ব্যাংকের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর প্রায় ৩০ লাখ গ্রাহক তাদের সঞ্চয় ও পেনশনের টাকা তুলতে পারছেন না। মূল শহর আসুনসিওনে ব্যাংকের শাখাগুলোর সামনে মঙ্গলবার ও বুধবার থেকে হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘ সারি দেখা যায়। জমানো টাকা ফেরত পাওয়ার দাবিতে বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ মানুষ। অনেক জায়গায় বিক্ষোভকারীদের সাথে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়, যেখানে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে।
পুরো ঘটনাটিকে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্নীতি বলে আখ্যা দিয়েছেন সেনেটর রাফায়েল ফিলিজোলা। তিনি বলেন, আমাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এর চেয়ে বড় দুর্নীতির ঘটনা আর ঘটেনি। এটি রাষ্ট্র, দেশের নাগরিক এবং পরাগুয়ের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তির ওপর এক মারাত্মক আঘাত।