মক্কা ও মদিনার পর জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদকে ইসলামের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মসজিদটিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়।
কয়েক বছর ধরে আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরাইলি ও ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই এলাকাটি এতো স্পর্শকাতর কেন?
পূর্ব-জেরুজালেমের পাহাড় চূড়ায় প্রায় ১৪ হেক্টর এলাকাজুড়ে আল-আকসা প্রাঙ্গণে অবস্থিত আল-আকসা মসজিদ। এটি কিবলি মসজিদ নামেও পরিচিত। এছাড়াও আছে সোনালী গম্বুজবিশিষ্ট ‘ডোম অফ দ্য রক’।
ঐতিহাসিকভাবেই আল-আকসা মুসলমানদের পবিত্র স্থান। তারপরও ইউনেস্কো এটিকে মুসলমানদের পবিত্র স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছে। শুধু মুসলিমরাই নয়, অন্য ধর্মের অনুসারীরাও আল-আকসাকে শ্রদ্ধা করে।
আল-আকসা চত্বরে রয়েছে বেশ কয়েকটি স্থাপনা। যার কোনটি মুসলমানের জন্য, কোনটি ইহুদিদের জন্য আবার কোনটি খ্রিস্টানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আর সব স্থাপনার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তিন ধর্মের ইতিহাস।
পূর্ব জেরুসালেমের পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত আল-আকসা মুসলিমদের কাছে ‘হারাম আল-শরীফ’ নামে পরিচিত এবং ইহুদিদের কাছে পরিচিত ‘টেম্পল মাউন্ট’ হিসেবে।
আরবি ভাষায়, আল-আকসার দুটি অর্থ রয়েছে; সবচেয়ে দূর, যা মক্কা থেকে এর দূরত্বকে বোঝায়। কুরআনে এ বিষয়ে উল্লেখ আছে এবং ‘সর্বোচ্চ’ হিসেবেও মুসলিমদের কাছে এর মর্যাদা ও গুরুত্ব আছে।
মুসলমানরা বিশ্বাস করেন, মুহাম্মদ মিরাজের রাতে কাবা শরিফ থেকে প্রথমে আল-আকসায় আসেন এবং মিরাজে গমনের আগে সেখানে সব নবীদের সঙ্গে নামাজের সময় ইমাম হিসেবে নামাজ আদায় করেন।
আল-আকসায় প্রথম ছোট একটি মসজিদ নির্মাণ করেন ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা ওমর, পরে ৭০৫ খ্রিস্টাব্দে এখানে প্রথম বড় আকারে মসজিদ নির্মাণ করা হয়।
দু'দফা ভূমিকম্পে দুবার ধ্বংস হয়ে গেলে পরে তা আবারও নির্মাণ করা হয়। সংস্কারও করা হয় কয়েকবার। তবে জেরুজালেমের এই জায়গাটিকে পবিত্র স্থান হিসেবে দাবি করে আসছে ইহুদি ও খ্রিস্টানরাও।
ইহুদিদের কাছে এটি টেম্পল মাউন্ট নামে পরিচিত। টেম্পল মাউন্টকে ঘিরে থাকা ওয়েস্টার্ন ওয়াল ইহুদিদের কাছে পৃথিবীর ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবে স্বীকৃত।
ইহুদিরা বিশ্বাস করে, এখানেই ছিল ইহুদিদের প্রথম ও দ্বিতীয় পবিত্র উপাসনালয়। অন্যদিকে খ্রিস্টানরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, এটাই সেই জায়গা যেখানে যীশু খ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন।
ইহুদিরা বিশ্বাস করে, ‘টেম্পল মাউন্টেই’ তাদের পয়গম্বর আব্রাহাম তার পুত্র ইসমাইলকে উৎসর্গ করার জন্য নিয়ে এসেছিলেন। উল্লেখ্য ইহুদিদের পয়গম্বর আব্রাহাম ইসলাম ধর্মে নবী ইব্রাহিম হিসেবে পরিচিত।
অন্যদিকে খ্রিস্টানরা মনে প্রাণে বিশ্বাস করে এটাই সেই জায়গা যেখানে যীশু খ্রিস্ট ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিলেন আর এখানকার গুহাতেই তার দেহ রাখা হয়েছিল।
১৯৬৭ সালে জেরুজালেম দখলে নেয়ার পর থেকেই আল-আকসা মসজিদ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে ইসরাইল। এরপর নানা বিধিনিষেধ আর শর্ত পূরণের মাধ্যমে সেখানে ইবাদতের সুযোগ পেতেন সাধারণ মুসল্লিরা।
২০০৩ সালে জেরুজালেমে অবৈধ বসতি স্থাপনকারী ইহুদিদের আল-আকসায় প্রবেশের অনুমতি দেয় ইসরাইল। এরপর থেকে সংকট আরও গভীর হতে থাকে।
বিভিন্ন সময় ইহুদিরা মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে নিরীহ মুসল্লিদের ওপর হামলা চালানো শুরু করে। গত কয়েক বছর ধরে আল-আকসা প্রাঙ্গণে ইসরাইলি-ফিলিস্তিন সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে।
এই প্রাঙ্গণের যেমন ধর্মীয় গুরুত্ব রয়েছে এর পাশাপাশি ফিলিস্তিনি জনগণের সংস্কৃতি ও জাতীয়তার প্রতীকও এটি। যদিও ইসরাইল সৃষ্টির বহু আগে থেকেই জেরুজালেম নিয়ে সংঘাত চলছে।