ছোটবেলা থেকেই মানুষ কম বেশি যে শব্দটির সঙ্গে পরিচিত সেটির নাম গাধা। কোনো ভুল করলেই গাধার সঙ্গে তুলনা করা যেন রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমাদের অনেকেই গাধা দেখিনি। তবে নিরীহ কিন্তু জেদী এই প্রাণীটির জন্য রয়েছে বিশ্ব গাধা দিবস। প্রতি বছরের ৮ মে বিশ্ব গাধা দিবস উদযাপন করা হয়।
গাধা একটি পরিশ্রমী প্রাণি; যারা সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমকে ভয় পায় না। গাধা গাড়ি টানে, কলকারখানা চালায়, মাইলের পর মাইল পথ হেঁটে মালামাল বহন করে। এমনকি অন্য প্রাণী হাল ছেড়ে দিলেও গাধা হাল ছাড়ে না। তারা মালিকের প্রতি অনুগত থাকে। মজার বিষয়, সেই গাধাই এখন মানুষের বুলি।
শুধু কি তাই, এই গাধকে ঘিরে গড়ে উঠেছে ভয়ংকর এক চোলাচালান চক্র। প্রশ্ন উঠতে পারে, গাধার মতো প্রাণী কেন চোরাচালানের শিকার? এর পেছনে রয়েছে চীনের একটি ঐতিহ্যবাহী ভেষজ ওষুধ। সেই ওষুধ তৈরিতে দরকার হয় গাধার চামড়া। আর সেই চামড়ার জন্যই প্রতি বছর হত্যা করা হয় লক্ষ লক্ষ গাধা।
পশুপ্রেমী এবং ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ই-জিয়াও নামে পরিচিত একটি ঐতিহ্যবাহী ওষুধের জন্য চীনের চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ গাধাকে জবাই করা হচ্ছে। তারপর সেসব গাধার চামড়া বৈধ ও অবৈধ পথে চীনে পাচার করা হচ্ছে। ফলে আফ্রিকা মহাদেশে বিপজ্জনক হারে কমছে গাধার সংখ্যা।
হাজার হাজার বছর ধরে চীনে তৈরি হচ্ছে ই-জিয়াও নামের একটি ভেষজ ওষুধ। এই ওষুধটি গাধার চামড়া থেকে নিষ্কাশিত কোলাজেন ব্যবহার করে তৈরি হয়। এটি খাদ্য ও সৌন্দর্য পণ্যের অত্যাবশ্যক উপাদান, যা অনেক চীনার বিশ্বাস, এটি রক্ত বাড়ায়, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত করতে এবং রোগ প্রতিরোধ করে।
আফ্রিকা মহাদেশেই প্রথম গাধাকে গৃহপালিত পশুর তকমা দেয়। তার পর গোটা বিশ্বেই এই পশুর ব্যবহার বৃদ্ধি পেতে থাকে। কমপক্ষে পাঁচ হাজার বছর ধরে গাধা মালবাহী পশু হিসাবে ব্যবহার হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাধার প্রয়োজনীয়তাও বেড়েছে। গাধা নিয়ে চীন ও আফ্রিকার মধ্যে দড়ি টানাটানিও শুরু হয়েছে।
বিশ্বে আনুমানিক ৫০ কোটি মানুষ গাধার উপর নির্ভরশীল। শুধু মাল বহনই নয়, কৃষি কাজেও গাধাকে ব্যবহার করতে দেখা যায় বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষ করে আফ্রিকা মহাদেশের দরিদ্র দেশগুলোতে। কারণ সেখানকার কৃষকদের গরু-মহিষ কেনার সামর্থ্য নেই। ফলে সেসব দেশের গাধার প্রজননও বেশি।
কিন্তু গাধা নিয়ে যে দুই দেশের মধ্যে টানাপড়েন শুরু হতে পারে, তা কয়েক দশক আগেও কল্পনার বাইরে ছিল। এই টানাপড়েনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি ওষুধ। সেই ওষুধ তৈরিতে নাকি গাধার প্রয়োজন। ব্যস, সেই থেকে ধীরে ধীরে বিশ্ব জুড়ে গাধার সংখ্যা কমতে শুরু করে। হুমকিতে পরে গাধার অস্তিত্ব।
ই-জিয়াও ওষুধ শিল্পের জন্য বছরে আনুমানিক ৬০ লাখ গাধার চামড়ার প্রয়োজন। এর প্রভাবে চীনে গাধার সংখ্যা ১৯৯২ সালের এক কোটি ১০ লাখ থেকে বর্তমানে আশি ভাগ কমে ২০ লাখে দাঁড়িয়েছে। ফলে গাধার চামড়া আমদানিতে ঝুঁকে পড়ে চীন। সঙ্গত কারণেই দেশটির চোখ পড়ে আফ্রিকার উপর।
আফ্রিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গাধা থাকায়, এটি পশুটির চামড়ার মূল উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাই চীনের চাগিদা মেটাতে মহাদেশটি জুড়ে বেড়েছে গাধা হত্যার ঘটনা। শুধু তা-ই নয়, চোরাচালানকারীদের নজরেও রয়েছে গাধা। অবৈধ ভাবে এই গৃহপালিত পশু কেনাবেচা চলচ্ছে দেদারচ্ছে।
প্রথমে রাজপরিবার এবং সমাজের অভিজাত শ্রেণির মানুষের মধ্যেই ই-জিয়াওয়ের গ্রহণযোগ্যতা ছিল। তবে এখন সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যেই এই ওষুধের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে ই-জিয়াওয়ের রমরমা বাড়ে চীনের বাজারে। প্রতি বছর ফুলে ফেঁপে উঠছে এই বাজার।
চীনের ব্যবসায়ীরাও গাধার চামড়ার জন্য পাগল হয়ে উঠেন। এতে বিপন্ন হয় আফ্রিকাতে গাধার অস্তিত্ব। পরে বিপদ বুঝতে পেরে চলতি বছরের ফ্রেব্রুয়ারিতে ৫৫ সদস্যের আফ্রিকান ইউনিয়ন চামড়ার জন্য গাধা জবাই নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সেই সঙ্গে চিঠি দিয়ে চীনকে বিষয়টি জানিয়েও দেয়া হয়।
চিঠির বক্তব্য, বহুবার অনুরোধের পরও, চীন গাধার চামড়া চোরাচালান রুখতে, কোনও ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। চীনে রফতানির জন্যই আফ্রিকায় লাগাতার গাধা নিধন হচ্ছে। তাই বেইজিং সক্রিয় না হলে আফ্রিকা থেকেই হয়তো গাধারা মুছে যাবে। গেলো বছরেই আফ্রিকায় ৬৫ হাজার গাধাকে মারা হয়েছে শুধু চামড়ার লোভে।
তারপর সেসব ঘুরপথে চীনে পাঠানো হয়েছে। ঠিক কী কারণে এতটা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ল আফ্রিকার ছোট-বড় দেশগুলো? গাধা সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা অলাভজনক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ডানকি স্যাংকচুয়ারির হিসাব অনুসারে, গেল দশ বছরে প্রায় ৬০ লাখ গাধাকে হত্যা করা হয়েছে চীনা বাজারের চাহিদা মেটাতে।
আটলান্টিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গাধা বাণিজ্য চীন-আফ্রিকা দ্বন্দ্বের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে। আফ্রিকার ওপর ঋণসহ অন্যান্য নীতিগত বিষয়ে চীন যত চাপ দিচ্ছে, গাধা রপ্তানিতে আফ্রিকা তত কঠোর হচ্ছে। ইতিমধ্যে তারা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। চামড়া রপ্তানি বন্ধ করার হুমকিও দিয়েছে।
ই-জিয়াও ওষুধ তৈরির প্রক্রিয়ায় জেলটিন পেতে গাধার চামড়া সংগ্রহ করার পর সেটি প্রথমে সিদ্ধ করা হয়। তারপর ছাঁকা, কাটা, শুকানো এবং পরিষ্কার করাসহ অনেকগুলো ধাপ রয়েছে। চূড়ান্ত পণ্য থেকে ওষুধ, ফেস ক্রিম এবং লিকার থেকে কেক ও ক্যান্ডি পর্যন্ত তৈরি করা হচ্ছে। চীনারা হুমড়ি খেয়ে কিনছেনও।