ট্রাম্পের বেইজিং ভোজনে থাকছে যেসব পদ

ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি জিনপিং যখন বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে এক রাজকীয় রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে মুখোমুখি বসবেন, তখন তাঁদের টেবিলের ওপর শুধু ভূ-রাজনীতি নয়, বরং সাজানো থাকবে চীনের কয়েক হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী ‘হুয়াইয়াং’ রন্ধনশৈলীর নানা পদ।

সাংহাই সংলগ্ন অঞ্চলের এই বিশেষ ঘরানার খাবার তার হালকা স্বাদ, সূক্ষ্ম ছুরির কাজ এবং ঋতুভিত্তিক পদের জন্য বিশ্বখ্যাত। চীনের ইতিহাসে এই খাবার শুধু উদরপূর্তির মাধ্যম নয়, বরং এক শক্তিশালী কূটনৈতিক হাতিয়ার।

চীনের আধুনিক ইতিহাসে দুর্ভিক্ষ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দীর্ঘ সময় সাধারণ মানুষের জন্য খাদ্য ছিল একটি দুষ্প্রাপ্য মর্যাদা বা স্ট্যাটাস সিম্বল। সেই প্রেক্ষাপটে বিদেশি অতিথিদের আপ্যায়নে খাবারের প্রতীকী ব্যবহার অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।


সাংহাইয়ের অভিজাত ‘গুই হুয়া লু’ রেস্তোরাঁর নির্বাহী শেফ শি কিয়াংয়ের মতে, হুয়াইয়াং খাবারের মূল শক্তি হলো এর সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। এর স্বাদ খুব একটা কড়া নয়, যা আন্তর্জাতিক অতিথিদের কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। সবচেয়ে বড় কথা, এই রাজকীয় ভোজের দর্শন বিলাসিতা বা দামি উপকরণের ওপর নির্ভর করে না, বরং এর কারুকার্যই একে অনন্য করে তোলে।

চীনের আটটি প্রধান আঞ্চলিক রন্ধনশৈলীর মধ্যে হুয়াইয়াং দীর্ঘকাল ধরে কূটনৈতিক মঞ্চের মধ্যমণি। ১৯৪৯ সালে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠাতা ভোজসভা থেকে শুরু করে ১৯৯৯ সালের ৫০তম বার্ষিকী, সবখানেই ছিল এই খাবারের দাপট। এমনকি ২০০২ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াং জেমিন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে আপ্যায়ন করেছিলেন, তখনও মেনুতে ছিল এই হুয়াইয়াং ঘরানা।

এমনকি ১ জুলাই ১৯৭১ সালে হেনরি কিসিঞ্জারের গোপন সফরের সময় তাঁর নামে একটি বিশেষ ‘চিকেন ডিশ’ তৈরি করেছিল চীন, যা আজও বিখ্যাত। আবার অনেক সময় বিদেশি নেতাদের পছন্দের খাবারগুলো স্থানীয় রেস্তোরাঁগুলোতে ‘সেট ব্যাংকুয়েট’ হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

যেমন, ২০২৩ সালে জ্যানেট ইয়েলেনের বেইজিংয়ে ‘ম্যাজিক মাশরুম’ বা ২০১১ সালে জো বাইডেনের লিভার ফ্রাই খাওয়ার ঘটনাগুলো ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছিল।


মেনুতে যা যা থাকতে পারে:
হুয়াইয়াং রন্ধনশৈলীর কিছু আইকনিক পদের নাম শুনলেই জিভে জল আসতে বাধ্য। থাকছে লায়ন’স হেড নামের তুলতুলে এবং নরম পর্ক মিটবল। ওয়েনসি তোফু- এটি মূলত শেফদের দক্ষতার পরীক্ষা। তোফুর একটি ব্লককে কেটে হাজার হাজার সুক্ষ্ম সুতার মতো স্লাইস করা হয়।

কাঠবিড়ালি মাছ- টক-মিষ্টি সস দিয়ে কড়া করে ভাজা মাছ, যা দেখতে অনেকটা কাঠবিড়ালির লেজের মতো। ইয়াংজু ফ্রাইড রাইস- বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় এই ভাতের পদটিও এই ঘরানার।

ইয়াংজি নদীর অববাহিকায় পাওয়া মিঠা পানির মাছ, বাইন মাছ এবং বাঁশ কোঁড়ল এই রান্নার প্রধান অনুষঙ্গ। উত্তর চীনের শানডং খাবারের চেয়ে এটি হালকা, সিচুয়ান খাবারের মতো ঝাল নয় এবং ক্যান্টোনিজ খাবারের মতো খুব বেশি বিদেশি উপকরণের ওপর নির্ভরশীল নয়। খাবার গবেষক ক্রিস্টোফার সেন্ট ক্যাভিসের মতে, ওয়াশিংটনের কোনো ভোজে যেমন ‘চিকেন’ পরিবেশন করা সবচেয়ে নিরাপদ, চীনের ব্যাংকুয়েটে হুয়াইয়াং খাবারও ঠিক তেমন, যেখানে অতিথির অসন্তুষ্ট হওয়ার বা ঝালে মুখ পুড়ে যাওয়ার ভয় নেই।


ট্রাম্পের রসনা বিলাস:
২০১৭ সালে ট্রাম্প যখন শেষবার চীন সফর করেছিলেন, তখন তাঁর জন্য হুয়াইয়াং স্টাইলে সবজি এবং টমেটো দিয়ে সেদ্ধ গরুর মাংস পরিবেশন করা হয়েছিল। ট্রাম্পের ‘ওয়েল-ডান স্টেক’ বা কড়া ভাজা মাংসের প্রতি বিশেষ অনুরাগের কথা মাথায় রেখেই বেইজিং সেবার এই মেনু সাজিয়েছিল। এবারও শি জিনপিংয়ের আতিথেয়তায় ট্রাম্পের পাতে তাঁর ব্যক্তিগত রুচি আর চীনের আভিজাত্যের এক দারুণ মিশেল দেখা যাবে বলেই আশা করা হচ্ছে।

বড় বড় চুক্তি বা তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনার ফাঁকে এই সুস্বাদু আহার শুধু দুই নেতার ক্লান্তিই দূর করবে না, বরং ‘ফুড ডিপ্লোম্যাসি’র মাধ্যমে দুই পরাশক্তির মধ্যকার বরফ গলাতেও সাহায্য করবে। রাজনীতির ময়দানে লড়াই চললেও, ডাইনিং টেবিলে হুয়াইয়াং খাবারের স্নিগ্ধতা এক পশলা শান্তির বাতাস নিয়ে আসুক, এমনটাই প্রত্যাশা বিশ্বের।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স