দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নিজেদের সামরিক উপস্থিতির পরিধি বিস্তৃত করতে লাওসের রাজধানী ভিয়েনতিয়েন থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে বান কেউন বিমানঘাঁটি এলাকায় একটি নতুন যৌথ সামরিক সহায়তা কেন্দ্র গড়ে তুলেছে চীন। উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, গত এক বছরে এককালের ফসলি জমি ও মেঠো পথ রূপ নিয়েছে বিশালাকার পাকা রানওয়ে, ট্যাক্সিওয়ে এবং নতুন নতুন সামরিক স্থাপনায়।
গত মঙ্গলবার চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক ঘোষণায় জানায়, ‘চীন-লাওস জয়েন্ট সাপোর্ট অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার’ এবং ‘চীন-লাওস ফ্রেন্ডশিপ এভিয়েশন একাডেমি’ এখন পুরোপুরি কার্যকর রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জিবুতি ও কম্বোডিয়ার পর এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) প্রথম পূর্ণাঙ্গ লজিস্টিক ও প্রশিক্ষণ ঘাঁটি হতে যাচ্ছে, যা এই অঞ্চলে চীনের ভৌগোলিক ও কৌশলগত শক্তি বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
ঐতিহাসিক পরিবর্তন ও পরিকাঠামো উন্নয়ন: যে এলাকাটিতে চীন তাদের নতুন ঘাঁটি নির্মাণ করেছে, নথিপত্র অনুযায়ী ১৯৬০ ও ৭০-এর দশকে ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়া যুদ্ধের সময় তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহৃত একটি মেঠো এয়ারস্ট্রিপ ছিল।
তবে ২০১৫ সালের শেষদিক থেকে শুরু করে সম্প্রতি প্রকাশিত বাণিজ্যিক উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, মেঠো পথটি এখন আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক সামরিক রানওয়ে এবং সুপরিসর হ্যাঙ্গারে পরিণত হয়েছে। চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে এই স্থাপনাটি মূলত বিমান বাহিনীর পাইলটদের প্রশিক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হবে এবং এটি কোনো তৃতীয় পক্ষের বিরুদ্ধে নির্দেশিত নয়।
তবে লাওসের মতো একটি অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা দেশে চীনের দীর্ঘমেয়াদী সামরিক অবস্থানকে ভিন্ন চোখে দেখছেন সাবিশ্লেষকরা। সিঙ্গাপুরের এস. রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক কলিন কোহ সামাজিক মাধ্যমে উল্লেখ করেছেন, কম্বোডিয়ার রিম নৌঘাঁটির চেয়ে লাওসের এই ঘাঁটিটি আফ্রিকার জিবুতিতে অবস্থিত চীনের পূর্ণাঙ্গ ঘাঁটির সাথেই বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।
লাওসের সাথে সামরিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক ভারসাম্য: একদলীয় কমিউনিস্ট শাসিত দেশ লাওসের সামরিক বাহিনী তুলনামূলকভাবে ছোট এবং তারা মূলত চীন ও রাশিয়ার তৈরি বিমানের ওপর নির্ভরশীল। আগে লাওসের সৈন্যদের উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য চীন, ভিয়েতনাম বা রাশিয়ায় যেতে হতো, তবে এখন তারা নিজ দেশের মাটিতেই চীনের সহায়তায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে পারবে।
লাওসের প্রেসিডেন্ট থংলুন সিসৌলিথ জুন মাসে বেইজিং সফরে গেলে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং দুই দেশের মধ্যে জাতীয় প্রতিরক্ষাসহ কৌশলগত সংলাপ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছিলেন।
অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক রাচেল ভ্যান্ডেনব্রিংক জানান, চীনের নিজস্ব ইউনান প্রদেশ থেকে সামরিক শক্তি প্রদর্শন সহজ হলেও, লাওসে এই ধরনের স্থায়ী ঘাটি নির্মাণের মূল লক্ষ্য হলো লাও সশস্ত্র বাহিনীর সাথে চীনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় একটি স্থায়ী সামরিক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা।
যুক্তরাষ্ট্র ও প্রতিবেশীদের নজরদারি: যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে চীনের সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণের ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখছে। মার্কিন পেন্টাগনের বার্ষিক প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে চীনের ২২টি সম্ভাব্য সামরিক স্থাপনার কথা উল্লেখ করা হলেও সেই তালিকায় লাওসের নাম ছিল না। ফলে হুট করে এই ঘাঁটির উন্মোচনে ওয়াশিংটন ও তার আঞ্চলিক মিত্ররা কিছুটা চমকিত।
লাওসের প্রতিবেশী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র থাইল্যান্ড জানিয়েছে, সার্বভৌম দেশ হিসেবে লাওস কার সাথে সামরিক অংশীদারিত্ব করবে তা তাদের নিজস্ব সিদ্ধান্ত হলেও থাইল্যান্ড সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর কড়া নজর রাখছে। দক্ষিণ চীন সাগরের বিরোধপূর্ণ স্প্রাটলি ও পারাসেল দ্বীপে সামরিক রানওয়ে ও নজরদারি ব্যবস্থা বসানোর পর, লাওসে চীনের এই নতুন লজিস্টিক কেন্দ্র মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মার্কিন সামরিক প্রভাবকে টেক্কা দেওয়ার এক নতুন বার্তা দিচ্ছে।
তথ্যসূত্র: রয়টার্স