দুই কোরিয়াকে বিভক্তকারী ‘ডিমিলিটারাইজড জোন’-এ সীমান্তে উত্তর কোরিয়া ক্রমাগত তাদের সামরিক উপস্থিতি ও গোলান্দাজ বাহিনীর সরঞ্জাম জোরদার করার কারণে সীমান্ত সংলগ্ন দক্ষিণ কোরিয়ার পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে ঘুরতে যাওয়া স্থানীয় ও বিদেশী পর্যটকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
গত সেপ্টেম্বর মাসে দুই দেশের সংবেদনশীল সীমান্ত এলাকায় ল্যান্ডমাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার তিনজন সেনাসদস্য আহত হওয়ার পর থেকেই সিউল ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে কথার যুদ্ধ তীব্র আকার ধারণ করে। দক্ষিণ কোরিয়া ঘটনার জন্য উত্তর কোরিয়ার ক্ষমা দাবি করলেও পিয়ংইয়ং ঘটনাটিকে দক্ষিণ কোরিয়ার 'মনগড়া গল্প' বলে আখ্যা দেয়। এই উত্তেজনার মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ নেতা কিম জং উনের শক্তিশালী বোন কিম ইয়ো জং হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান যে, পুরো সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়া-বিরোধী প্রচারণামূলক লাউডস্পিকার বসানো হচ্ছে এবং যেকোনো সময় নতুন পাল্টা ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে।
এরই ধারাবাহিকতায়, গত শুক্রবার দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে প্রথম একটি সাঁজোয়া যান দৃশ্যমান হয়। তবে সোমবার নাগাদ রয়টার্সের প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, সীমানার ঠিক ওপারে দক্ষিণে মুখ করে অন্তত তিনটি আর্মার্ড ভেহিকেল বা সাঁজোয়া কামান পুরোপুরি প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গিমপো এলাকায় অবস্থিত ‘এগিবং অবজারভেটরি’- যা থেকে মাত্র ১.৪ কিলোমিটার দূরে উত্তর কোরিয়ার কাপুং কাউন্টি দেখা যায়, সেখানকার দর্শনার্থীরা সরাসরি খালি চোখে এই সামরিক সাজসজ্জা দেখতে পাচ্ছন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নেওয়া ৮৩ বছর বয়সী প্রবীণ সামরিক সদস্য জ্যাং গিল-সং সেখানে দাঁড়িয়ে তাঁর শঙ্কার কথা প্রকাশ করে বলেন, উত্তর কোরিয়া যে ১২২-মিমি কামান মোতায়েন করেছে তা এতদিন টিভিতেই দেখেছি, কিন্তু আজ এত কাছ থেকে দেখে বুঝলাম বিপদ কতটা মারাত্মক এবং বাস্তব। ভবিষ্যতে সিউল কীভাবে এর মুখোমুখি হবে তা নিয়ে আমি সত্যিই চিন্তিত। কানাডা থেকে আসা ২৮ বছর বয়সী পর্যটক হান্না রবিন্স জানান, তাঁদের গাইড কামানগুলো দেখিয়ে বলছিলেন 'ভয় পাবেন না, ওরা গুলি চালাবে না', তবে বাস্তবতাটি বেশ থমথমে এবং উদ্বেগজনক।
সামরিক বিশ্লেষকরা এসব দূরপাল্লার অস্ত্রকে উত্তর কোরিয়ার সেলফ-প্রোপেল্ড হাউইটজার কামান হিসেবে শনাক্ত করেছেন, যেগুলো ১৯৭০-এর দশকের শেষ দিকে দেশটির সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সিউলের আসান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের সামরিক বিশেষজ্ঞ ইয়াং উক জানান, এই কামানগুলোর সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ২৪ কিলোমিটার (১৫ মাইল), যা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র অবস্থিত গিমপো শহরকে সহজে আঘাত হানার আওতায় নিয়ে আসে। তবে অস্ত্রগুলোকে কৌশলগত যুদ্ধক্ষমতা বাড়ানোর চেয়ে বেশি 'অস্ত্রের শক্তি প্রদর্শন' এবং প্রকাশ্যে ভয় দেখানোর অংশ বলেই মন্তব্য করেছেন তিনি।
একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ার জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের মুখপাত্র জ্যাং দো-ইয়ং সিউলে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে জানান, উত্তর কোরিয়া সাম্প্রতিক বিবৃতিতে নতুন নতুন অত্যাধুনিক অস্ত্রের কথা উল্লেখ করলেও সীমান্তে দৃশ্যমান এই কামানগুলো তাদের পুরনো ও ঐতিহ্যগত সামরিক কাঠামোরই অংশ। সামরিক দিক দিয়ে এটি নতুন কৌশল না হলেও দুই দেশের মধ্যকার সীমান্তে বর্তমান পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতিকে স্পষ্ট করে তুলেছে।