কি কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নিলো নেদারল্যান্ডস?

গভীর ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডা থেকে শত শত কোটি ডলার সমমূল্যের স্বর্ণের রিজার্ভ যুক্তরাজ্যে সরিয়ে নিয়েছে নেদারল্যান্ডস। বুধবার ডাচ সেন্ট্রাল ব্যাংক (ডিএনবি) জানিয়েছে, সম্ভাব্য যে কোনো গভীর সংকটের মোকাবিলায় আরও ভালোভাবে প্রস্তুত থাকতেই নিজেদের স্বর্ণের এই নতুন বিন্যাস সম্পন্ন করেছে তারা।

ডিএনবি নির্দিষ্ট কোনো সংকটের কথা উল্লেখ না করলেও, ওয়াশিংটন বর্তমানে কানাডার সঙ্গে এক তীব্র শুল্কযুদ্ধে লিপ্ত রয়েছে। পাশাপাশি তারা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করছে এবং সম্প্রতি ভেনিজুয়েলা ও কিউবা সংলগ্ন এলাকায় বড় ধরনের সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে।

উপরন্তু, গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইউরোপীয় মিত্রদের সরাসরি অংশ না নেওয়ার কারণে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, যা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সম্পর্কে বড় ধরনের ফাটল ধরিয়েছে।

ডিএনবি’র প্রেসিডেন্ট ওলাফ স্লিজপেন এক বিবৃতিতে বলেন, এই স্থানান্তরের মাধ্যমে আমরা আমাদের স্বর্ণের সহজ বিনিময়যোগ্যতা নিশ্চিত করেছি। আমরা আশা করি এটি ব্যবহারের কখনো প্রয়োজন পড়বে না, তবে আমাদের আর্থিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতি জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

Dutch Gold 04
নেদারল্যান্ডসের কতটুকু স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে?

নেদারল্যান্ডসের কাছে বর্তমানে ৬১২.৪ টন স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭২.২ বিলিয়ন ইউরো (৮৩.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। যেকোনো আর্থিক বা বৈশ্বিক সংকটে প্রচলিত অর্থ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে এই রিজার্ভ নিরাপত্তা গ্যারান্টি হিসেবে কাজ করে। সাধারণত ঝুঁকি কমাতে প্রতিটি দেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্রে তাদের রিজার্ভের স্বর্ণ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখে।

ডাচ সেন্ট্রাল ব্যাংক তাদের এই সঞ্চয় নিজস্ব 'জাইস্ট' ক্যাশ সেন্টারসহ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোতে রেখেছিল। এতদিন জাইস্টে ৩০.৮ শতাংশ, নিউ ইয়র্কে ৩১.৩ শতাংশ, অটোয়ায় ১৯.৭ শতাংশ এবং লন্ডনে ১৮.১ শতাংশ স্বর্ণ সংরক্ষিত ছিল।

উত্তর আমেরিকা থেকে যুক্তরাজ্যে স্থানান্তরের পর এই ভৌগোলিক বিন্যাসে নতুন পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে জাইস্টে ৩০.৮ শতাংশ, লন্ডনে ৩২.১ শতাংশ, নিউ ইয়র্কে ১৮.৫ শতাংশ এবং অটোয়ায় ১৮.৫ শতাংশ করে স্বর্ণের সঞ্চয় রাখা হয়েছে।

Dutch Gold 05
কীভাবে এই বিশাল পরিমাণ স্বর্ণ স্থানান্তর করা হলো?

স্থানান্তরিত এই স্বর্ণের অর্থমূল্য ২০২৫ সালের শেষে ছিল প্রায় ১০.১১ বিলিয়ন ইউরো (১১.৭৩ বিলিয়ন ডলার)। জটিল শারীরিক পরিবহন এড়াতে ও ঝুঁকি কমাতে ডিএনবি মূলত দুটি কৌশল একসঙ্গে ব্যবহার করেছে, এক স্থানে বিক্রি করে অন্য স্থানে কেনা এবং সরাসরি জাহাজে বা বিমানে স্বর্ণ স্থানান্তর করা।

প্রথমে নিউইয়র্ক থেকে প্রায় ৫৯ টন স্বর্ণ (আনুমানিক মূল্য ৮.৩ বিলিয়ন ডলার) বিক্রি করে সেই সমপরিমাণ অর্থ দিয়ে লন্ডনে নতুন করে স্বর্ণ কেনা হয়। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা থেকে ২৭ টনেরও বেশি স্বর্ণ (যার মূল্য ৩.৮৪ বিলিয়ন ডলার) সরাসরি জাইস্টে আনা হয় এবং জাইস্ট থেকে সমপরিমাণ আন্তর্জাতিক মানের স্বর্ণের বার লন্ডনে পাঠানো হয়। এর ফলে স্বর্ণ গালিয়ে পুনর্নির্মাণের বাড়তি খরচ বেঁচে যায়। সব মিলিয়ে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রায় ১০.৭ বিলিয়ন ডলার এবং অটোয়া থেকে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের স্বর্ণ স্থানান্তরিত হয়েছে।

কেন এই পন্থায় স্বর্ণ সরিয়ে নিল নেদারল্যান্ডস?

ডিএনবি জানায়, ক্রয়-বিক্রয় ও সরাসরি পরিবহনের সংমিশ্রণ ছিল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। এর ফলে স্থানান্তর সংক্রান্ত আর্থিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো গেছে। তাছাড়া ভবিষ্যতে কোনো বড় সংকটের সময় আন্তর্জাতিক পরিবহন বন্ধ হয়ে গেলেও যেন বিকল্প পন্থায় রিজার্ভ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেই অভিজ্ঞতা অর্জনের অংশ হিসেবেই এই প্রক্রিয়া বেছে নেওয়া হয়েছে।

Dutch Gold 02
যুক্তরাষ্ট্র থেকে কেন স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে নেদারল্যান্ডস?

লন্ডন আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে স্বর্ণ কেনাবেচার সবচেয়ে নিরাপদ ও দ্রুততম মাধ্যম। ডিএনবি জানিয়েছে, নিউইয়র্ক বা অটোয়ায় থাকা স্বর্ণ জরুরি দরকারে দ্রুততম সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্যবহার করা কঠিন। লন্ডনে রিজার্ভের বড় অংশ রাখা বিশ্ব আর্থিক বাজারে ডাচ অর্থনীতি ও স্বর্ণের ওপর আস্থার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।

তবে বিশ্লেষকরা ধারণা করছেন, আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পারের রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক অস্থিরতাই নেদারল্যান্ডসকে এই সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। ফরাসি প্রতিষ্ঠান 'ন্যাশনাল গোল্ড কাউন্টার'-এর প্রেসিডেন্ট লরেন্ট সোয়ার্টজ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে তাদের নিরাপত্তার জন্য ভিন্ন স্থান বেছে নিতে উৎসাহিত করছে।

১. যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা বাণিজ্যিক যুদ্ধ: গত বছর থেকেই ওয়াশিংটন ও অটোয়ার মধ্যে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও গাড়ি খাত নিয়ে বাণিজ্য যুদ্ধ চলছে। গত আগস্টে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর কানাডার ২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। জবাবে অটোয়াও ৮ সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর হতে যাওয়া ৭০০টিরও বেশি মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে।

২. আন্তর্জাতিক সামরিক অভিযান: ট্রাম্প প্রশাসনের দীর্ঘায়িত ইরান যুদ্ধ ছাড়াও চলতি বছরের জানুয়ারিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী এক ঝটিকা অভিযানে ভেনিজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তার করে দেশে নিয়ে যায় এবং দেশটির তেল খাতের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিউবার চারপাশ ঘিরেও সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে ওয়াশিংটন।

Dutch Gold 03
৩. ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র ট্রাম্পকালীন তিক্ততা:
ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর গ্রিনল্যান্ড ক্রয়ের ইচ্ছা পুনরায় ব্যক্ত করে ইউরোপীয় মিত্রদের শুল্কের হুমকি দেন। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলার কারণে তেলের সংকটের সময় ইউরোপীয় দেশগুলোকে সরাসরি সাহায্য না করে নিজের স্বার্থ উদ্ধারের পরামর্শ দেন তিনি। অন্যদিকে মার্কিন যুদ্ধবিমানকে নিজেদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না দেওয়া বা সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার কারণে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনের ওপর ট্রাম্প ক্ষোভ প্রকাশ করলে ট্রান্স-আটলান্টিক কূটনৈতিক সম্পর্ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৪. সম্পদ ফ্রিজ করার ভয়াবহ আন্তর্জাতিক নজির: ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়া থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও জি-৭ জোটের প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের জাতীয় সম্পদ স্থগিত (ফ্রিজ) করা এবং পরবর্তীতে সেই সম্পদ থেকে ইউক্রেনকে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আর্থিক নীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন এনেছে। সম্প্রতি এই ফ্রিজ করার সিদ্ধান্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য বাড়ানোয় অনেক দেশই মনে করছে, যেকোনো রাজনৈতিক অস্থিরতায় মিত্র দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকেও নিজেদের সম্পদ অনিরাপদ হয়ে পড়তে পারে।

অন্যান্য দেশও কি যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নিচ্ছে?

যুক্তরাষ্ট্র থেকে স্বর্ণ সরিয়ে নেওয়ার তালিকায় নেদারল্যান্ড কথাই প্রথম নয়। চলতি বছরের জানুয়ারিতেই 'ব্যাংক দ্য ফ্রান্স' নিউইয়র্ক ফেডারেল রিজার্ভে রাখা ১২৯ টন স্বর্ণ (যার মূল্য ১৭ বিলিয়ন ডলার) প্যারিসে ফিরিয়ে নেয়। এর আগে ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে জার্মানিও নিউইয়র্ক থেকে তাদের ৬০০ টনেরও বেশি স্বর্ণের রিজার্ভ নিজস্ব শহর ফ্রাঙ্কফুর্টে সরিয়ে নিয়েছিল।