ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চরম উত্তেজনার মধ্যেই জেনেভায় শুরু হতে যাচ্ছে তৃতীয় দফার পারমাণবিক চুক্তির আলোচনা। এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আগে বুধবার 'ইন্ডিয়া টুডে'-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি তাঁর দেশের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির বিশাল উপস্থিতি এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রমাগত হুমকির মধ্যেই বৃহস্পতিবার জেনেভায় মুখোমুখি বসছে তেহরান ও ওয়াশিংটন। এই হাই-ভোল্টেজ আলোচনার আগে ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, একটি ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ এবং সমতাপূর্ণ’ চুক্তিতে পৌঁছানো অবশ্যই সম্ভব, তবে ইরান যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি জানান, গত দফার আলোচনায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে এবং উভয় পক্ষ কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। সেই বোঝাপড়াগুলোকে ভিত্তি করেই একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি গড়ে তোলা সম্ভব বলে তিনি বিশ্বাস করেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, পারমাণবিক সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনার চেয়ে ভালো কোনো পথ নেই। তাঁর মতে, পশ্চিমা বিশ্বের যদি কোনো উদ্বেগ বা অস্পষ্টতা থাকে, ইরান তার উত্তর দিতে প্রস্তুত, কিন্তু নিজেদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক অধিকার থেকে তারা এক চুলও নড়বে না।
সাক্ষাৎকারে যখন প্রশ্ন করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হুমকির মুখে ইরান কতটা প্রস্তুত, আরাগচি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে বলেন, ইরান ‘যুদ্ধ ও শান্তি’ উভয় পরিস্থিতির জন্যই পুরোপুরি তৈরি। তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দর্শন তুলে ধরে বলেন, আমাদের লক্ষ্য হলো যুদ্ধ প্রতিরোধ করা। আর যখন আপনি যুদ্ধের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত থাকবেন, তখনই শুধু আপনি যুদ্ধ ঠেকাতে পারবেন। তিনি স্পষ্ট করেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনী যে কোনো পরিস্থিতির জন্য সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
ইরানি কর্মকর্তারা বারবার সতর্ক করেছেন, দেশটির ওপর যদি কোনো ধরনের ‘সীমিত’ হামলাও চালানো হয়, তবে তার প্রতিক্রিয়া হবে ভয়াবহ। তেমন পরিস্থিতিতে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং ইসরাইল সরাসরি ইরানি গোলার মুখে পড়বে বলে তেহরানের পক্ষ থেকে সোজা জানিয়ে দেয়া হয়েছে। আরাকচি মনে করিয়ে দেন, ইরানের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির বিরুদ্ধে কোনো ‘সামরিক সমাধান’ কার্যকর হতে পারে না।
ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক গবেষণা শুধু বেসামরিক ও জ্বালানি কাজের জন্য। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার রক্ষার ওপর ভিত্তি করেই যে কোনো আলোচনায় বসতে আগ্রহী তেহরান। বৃহস্পতিবারের জেনেভা বৈঠকটি কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সারা বিশ্বের কাছে একটি অগ্নিপরীক্ষা, কূটনীতি জয়ী হবে না কি মধ্যপ্রাচ্য এক ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ধাবিত হবে।
আব্বাস আরাগচির বক্তব্যে ফুটে উঠেছে এক ধরণের ‘সশস্ত্র কূটনীতি’। একদিকে তিনি শান্তির হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন, অন্যদিকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ইরানকে ভয় দেখিয়ে হারানো সম্ভব নয়। এখন দেখার বিষয়, জেনেভায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতিনিধিদের সাথে ইরানের এই আলোচনায় বরফ কতটা গলে।