মার্কিন সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন এখন এক কঠিন অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একদিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং অন্যদিকে পেন্টাগনের পেশাদার সামরিক সতর্কতা, এই দুইয়ের মাঝে ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে তাকে অনেকটা ‘দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটার’ মতো পরিস্থিতি সামলাতে হচ্ছে।

মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন-এর এক বিশেষ প্রতিবেদন এমন চাঞ্চল্যকর সব তথ্য উঠে এসেছে। এতে আরও বলা হয়েছে, জেনারেল ড্যান কেইন, যিনি একজন অভিজ্ঞ এফ-১৬ পাইলট ও সিআইএ’র সাবেক লিয়াজোঁ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে স্পর্শকাতর সামরিক সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছেন। ইরানের ওপর সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা যখন ডেস্কে, তখন কেইনকে দেখা যাচ্ছে অত্যন্ত সতর্ক ও রহস্যময় এক ভূমিকায়। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এ ধরনের খবর ঠিক নয়।
পেন্টাগনের অত্যন্ত সুরক্ষিত কনফারেন্স রুমের নাম- ‘ট্যাংক’। সেখানে বসেই বড় ধরনের সামরিক অভিযান নিয়ে শীর্ষ সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়। কিন্তু তথ্য ফাঁসের ভয়ে জেনারেল কেইন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের সরাসরি নিজের অফিসে ডেকে নিচ্ছেন। তিনি চান না, কোনো আগাম গুঞ্জন বা সন্দেহ তৈরি হোক। এই চরম গোপনীয়তা কেইনের চরিত্রের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।

কেইন সচেতনভাবে তাঁর পূর্বসূরী জেনারেল মার্ক মিলির পথ এড়িয়ে চলছেন। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে মিলি প্রায়ই প্রেসিডেন্টের প্রকাশ্য বিরোধিতা করতেন, যা তাদের সম্পর্কের অবনতি ঘটিয়েছিল। কেইন সেই সংঘাত এড়াতে ট্রাম্পের সামনে অনেকটা সংরক্ষিত থাকেন। তিনি সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তের বিরোধিতা না করে বরং প্রেসিডেন্টকে সব বিকল্প এবং তার ঝুঁকিগুলো বুঝিয়ে বলেন। তবে, ব্যক্তিগতভাবে কেইন ইরানের বিরুদ্ধে বড় অভিযানের জটিলতা ও আমেরিকান সেনাদের প্রাণহানির শঙ্কা নিয়ে উদ্বিগ্ন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জনসমক্ষে কেইনের ওপর অগাধ আস্থা প্রকাশ করেছেন। সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প লেখেন, কেইন কেবল ‘জিততে’ জানেন এবং নির্দেশ পেলে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবেন। এমনকি প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথের চেয়েও ট্রাম্পের কাছে কেইন বেশি গ্রহণযোগ্য বলে মনে করা হয়। তবে হেগসেথের সঙ্গে কেইনের সম্পর্ক সব সময় মসৃণ নয়। বিশেষ করে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ছাঁটাই এবং পদোন্নতি নিয়ে হেগসেথের কঠোর সিদ্ধান্তের সামনে কেইনকে প্রায়ই নতিস্বীকার করতে হয়েছে।

গত জানুয়ারিতে ভেনিজুয়েলার নেতাকে গ্রেপ্তারের অভিযানে কেইন বেশ আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু ইরানের ক্ষেত্রে তিনি কিছুটা রক্ষণশীল। গত সপ্তাহে সিচুয়েশন রুমে এক দীর্ঘ বৈঠকে কেইন স্বীকার করেছেন, ইরানে শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ফল ঠিক কী হতে পারে, তা আগে থেকে নিশ্চিত করে বলা কঠিন। ট্রাম্প চাইছেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কেন্দ্র থেকে শুরু করে শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করার পরিকল্পনা, যেখানে কেইন বারবার এই মিশনের ঝুঁকি ও ‘সেকেন্ডারি ইফেক্ট’ নিয়ে ভাবছেন।
কেইন কংগ্রেসকে কথা দিয়েছিলেন, তিনি সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিমুক্ত রাখবেন। কিন্তু ট্রাম্পের আমলে তা করা দুঃসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে ট্রাম্পের এক ভাষণে উপস্থিত জেনারেলদের তিনি পরামর্শ দিয়েছিলেন, কোনো হাততালি বা প্রতিক্রিয়া না দেখাতে, যেন সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষতা বজায় থাকে। এতে ট্রাম্প কিছুটা বিরক্তও হয়েছিলেন।

জেনারেল ড্যান কেইন বর্তমানে এমন এক অবস্থানে আছেন যেখানে তাকে একই সাথে প্রেসিডেন্টের বিশ্বস্ত হতে হচ্ছে এবং পেশাদার জেনারেল হিসেবে সম্ভাব্য যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। তিনি কি পারবেন ট্রাম্পের ‘ইয়েস ম্যান’ না হয়েও নিজের সামরিক প্রজ্ঞা দিয়ে একটি বড় বিপর্যয় এড়াতে? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভায় শুরু হতে যাওয়া কূটনৈতিক আলোচনা এবং কেইনের পরবর্তী সামরিক পরামর্শের ওপর।
