কেন ইরানের ‘খার্গ দ্বীপ’ এখন ট্রাম্পের প্রধান লক্ষ্যবস্তু?

উপসাগরীয় যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে পদার্পণ করার সঙ্গে সঙ্গে একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইরানি দ্বীপ খার্গ দ্বীপ এখন ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের সমর পরিকল্পনাবিদদের আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত এই দ্বীপটি ইরানের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে পরিচিত।

বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপে কোনো হামলা ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে তেলের দামকে আকাশচুম্বী করে তুলতে পারে।

বুশেহর প্রদেশের উপকূল থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটি ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এটি মূলত ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল। এখানকার রাজস্ব ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এবং ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কর্পসের অর্থের প্রধান উৎস।


ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে ইরান এখানে তেল উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে বাড়িয়েছিল। বর্তমানে এটি প্রতিদিন প্রায় ৪০ লক্ষ ব্যারেল তেল উৎপাদন ও সরবরাহ করার সক্ষমতা রাখে।

ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ইয়াইনেট নিউজের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন খার্গ দ্বীপে হামলার বিকল্পগুলো খতিয়ে দেখছে। সাবেক পেন্টাগন উপদেষ্টা মাইকেল রুবিন মনে করেন, এই দ্বীপে হামলা তেহরানের সামরিক শক্তি ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার ক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল করে দেবে।

অন্যদিকে, ইসরাইলি বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিদ এক্সে সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন, ইসরাইলের উচিত খার্গ দ্বীপের জ্বালানি শিল্প ধ্বংস করে দেয়া। তার মতে, এটি ইরান সরকারের পতনকে ত্বরান্বিত করবে।


ইসরাইল গত সপ্তাহে তেহরান এবং আলবোরজ অঞ্চলের জ্বালানি ডিপোতে হামলা চালালেও খার্গ দ্বীপ এখনো অক্ষত রয়েছে। এর পেছনে কিছু কৌশলগত কারণ রয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ইতিমধ্যেই ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, খার্গ দ্বীপে বড় কোনো হামলা তেলের দাম আরও অন্তত ১০ ডলার বাড়িয়ে দিতে পারে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

লন্ডন-ভিত্তিক জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অবকাঠামো ধ্বংস করলে তা শুধু বর্তমান সরকার নয়, বরং ইরানের ভবিষ্যৎ যে কোনো সরকারের জন্যই অর্থনীতি স্থিতিশীল করা অসম্ভব করে তুলবে।


খার্গ দ্বীপ লক্ষ্যবস্তু হবার ইতিহাস অনেক পুরনো। ১৯৭৯ সালের জিম্মি সংকটের সময় প্রেসিডেন্ট কার্টারকে এই দ্বীপ দখলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৮০-র দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইরাকি বাহিনী এই টার্মিনালটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, যা ইরান পরে পুনরায় গড়ে তোলে।

এবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে যখন খার্গ দ্বীপ বা ইরানের ইউরেনিয়াম মজুত দখলের কমান্ডো অভিযানের বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়, তিনি তা উড়িয়ে দেননি। তিনি সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, সব বিকল্পই এখন টেবিলের ওপর রয়েছে।

 
আপাতত খার্গ দ্বীপ শান্ত থাকলেও এটি এখন যুদ্ধের সবচেয়ে সংবেদনশীল কৌশলগত বিন্দু। এই দ্বীপে একটি মাত্র হামলা শুধু ইরানের মানচিত্র নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি মানচিত্রকেও বদলে দিতে পারে।