আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এখন আর শুধু বিশালাকার মিসাইল বা যুদ্ধবিমানের লড়াই নেই; যুদ্ধের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে ইরানের সস্তা অথচ প্রাণঘাতী ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ বা ড্রোনের ঝাঁক। পারস্য উপসাগর থেকে কুয়েত, সব খানেই এখন মার্কিন আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কঠিন পরীক্ষা নিচ্ছে তেহরানের এই খুদে ড্রোনের দল।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, পেন্টাগন এখন তাদের প্রথাগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছেড়ে ‘লেজার টেকনোলজি’ এবং ‘ড্রোন-অন-ড্রোন’ ইন্টারসেপ্টরের ওপর ভরসা করতে বাধ্য হচ্ছে।
গেলো মঙ্গলবারই সংযুক্ত আরব আমিরাত এক ভয়াবহ হামলার সাক্ষী হয়েছে। দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, ইরান থেকে ৯টি ব্যালেস্টিক মিসাইল এবং ৩৫টি ড্রোন ছোঁড়া হয়েছিল। আটটি মিসাইল রুখে দিলেও ৩৫টি ড্রোনের মধ্যে ২৬টি ধ্বংস করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৯টি ড্রোন মাটিতে আছড়ে পড়েছে।
ব্যালেস্টিক মিসাইল অনেক উঁচুতে এবং দ্রুত গতিতে চলে, যা প্যাট্রিয়ট বা থাডের মতো রাডারে সহজেই ধরা পড়ে। কিন্তু ড্রোনগুলো ওড়ে অনেক নিচ দিয়ে এবং ধীরগতিতে, যা শনাক্ত করা এবং প্রতিহত করা অত্যন্ত জটিল।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা এই ড্রোন যুদ্ধকে একটি বড় ‘ম্যাথ প্রবলেম’ বা অঙ্কের সমস্যা হিসেবে দেখছেন। কারণ, একটি ড্রোন ধ্বংস করতে যুক্তরাষ্ট্র যে মিসাইল ব্যবহার করে, তার একেকটির দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ইরানের প্রতিটি ড্রোনের দাম সেই তুলনায় নগণ্য।
যখন ইরান ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন পাঠায়, তখন প্রতিটি ড্রোন দামী মিসাইল দিয়ে ধ্বংস করা আমেরিকার জন্য অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়। এই ভারসাম্যহীনতা কাটাতে পেন্টাগন এখন ভিন্ন পথে হাঁটছে। ড্রোন সমস্যা সমাধানে পেন্টাগন এখন তিনটি স্তরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলছে।
মিসাইলের বদলে এখন লেজার রশ্মি দিয়ে ড্রোন ধ্বংস করার প্রযুক্তি আনা হচ্ছে। এর বড় সুবিধা হলো, যতক্ষণ বিদ্যুৎ বা শক্তি থাকবে, ততক্ষণ এটি অবিরাম গুলি চালিয়ে যেতে পারবে। এর জন্য আলাদা গোলাবারুদের প্রয়োজন নেই।
মেরোপস ড্রোন- এটি মূলত একটি ড্রোন শিকারি ড্রোন। ইউক্রেন যুদ্ধে সফল হবার পর এটি এখন মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হয়েছে। ট্রাক থেকে এই ছোট ড্রোনগুলো উৎক্ষেপণ করা হয়, যা আকাশে উড়ে গিয়ে ইরানের ড্রোনগুলোকে আঘাত করে ধ্বংস করে দেয়। রোডরানার- এটি একটি স্বায়ত্তশাসিত ইন্টারসেপ্টর ড্রোন, যা কাজ শেষে আবার ফিরে আসতে পারে।
গত ১ মার্চ কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজানের কাছে ইরানি ড্রোনের আঘাতে ৬ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ডজনখানেক আহত হন। এই ঘটনাটি পেন্টাগনকে সতর্ক করে দিয়েছে, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় সামান্য ছিদ্র থাকলেও বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে। মার্কিন কমান্ডাররা এখন ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাচ্ছেন।
ইউক্রেনে যেভাবে ইরানের তৈরি ‘শাহেদ’ ড্রোনগুলো রাশিয়ার হয়ে তাণ্ডব চালাচ্ছে, তা মোকাবিলা করার কৌশলগুলো এখন মধ্যপ্রাচ্যে প্রয়োগ করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে এখন এক অদৃশ্য ড্রোন যুদ্ধের দামামা বাজছে। ইরানের সস্তা ড্রোন বনাম আমেরিকার দামী লেজার- এই লড়াই নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতের যুদ্ধের ভাগ্য। পেন্টাগন এখন তাদের বাহিনীকে রক্ষা করতে প্রতি মুহূর্তে যুদ্ধের কৌশল বদলাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: ফক্স নিউজ