ইরানকে দমাতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে আরব দেশগুলো

পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো নিজ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে না চাইলেও, এখন তারা ওয়াশিংটনকে এক বিশেষ বার্তা দিচ্ছে। রয়টার্সকে দেয়া তিনটি উপসাগরীয় সূত্রের তথ্যমতে, আরব দেশগুলো চাইছে যুক্তরাষ্ট্র যেন এই যুদ্ধ মাঝপথে থামিয়ে না দেয়। তাদের ভয়, ইরানকে যদি এখনই সামরিকভাবে পঙ্গু করে না দেয়া হয়, তবে ভবিষ্যতে তারা আরও ভয়াবহভাবে এই অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণভোমরা ‘তেল সরবরাহ’ ব্যবস্থাকে জিম্মি করে ফেলবে।

সৌদি আরব ভিত্তিক উপসাগরীয় গবেষণা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান আব্দুল আজিজ সাগের জানান, এই অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একটি প্রবল ধারণা জন্মেছে যে ইরান প্রতিটি ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমা অতিক্রম করেছে। তিনি বলেন, শুরুতে আমরা ইরানের পক্ষ নিয়েছি এবং যুদ্ধের বিরোধিতা করেছি। কিন্তু যখন তারা সরাসরি আমাদের ওপর হামলা শুরু করল, তখন তারা শত্রুতে পরিণত হলো। এছাড়া তাদের আর অন্য কোনো বিশেষণে ডাকার সুযোগ নেই।


যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও আঞ্চলিক বৈধতা:
পশ্চিমা ও আরব কূটনীতিকদের মতে, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন বর্তমানে উপসাগরীয় দেশগুলোকে সরাসরি যুদ্ধে নামানোর জন্য প্রবল চাপ দিচ্ছে। ট্রাম্প চাইছেন ইরান অভিযানে আঞ্চলিক সমর্থন নিশ্চিত করতে, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে তাঁর এই যুদ্ধের একটি শক্ত বৈধতা তৈরি হয়।

নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ভাবমূর্তি রক্ষা: চলমান যুদ্ধের তিন সপ্তাহে ইরান ইতিমধ্যে উপসাগরীয় ছয়টি দেশের বিমানবন্দর, বন্দর এবং তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এতে শুধু ভৌত অবকাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি, বরং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা এই অঞ্চলের ‘নিরাপদ ও স্থিতিশীল’ ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। দুবাই ও কাতারের মতো দেশগুলো যারা পর্যটন ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল, তাদের অর্থনীতি এখন বড় ঝুঁকির মুখে।

কৌশলগত দ্বিধা ও মতানৈক্য: উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এক চরম কৌশলগত দ্বিধায় রয়েছে। একদিকে ইরানের তাৎক্ষণিক হামলা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সুদূরপ্রসারী ঝুঁকি। লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিকসের অধ্যাপক ফাওয়াজ গেরগেসের মতে, এই যুদ্ধে যোগ দিলে মার্কিন সামরিক শক্তিতে খুব একটা বাড়তি কিছু যোগ হবে না, কিন্তু আরব দেশগুলো ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার মুখে আরও বেশি অরক্ষিত হয়ে পড়বে।

এখন পর্যন্ত এই ছয়টি দেশ (বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, ওমান এবং ইউএই) মাত্র একটি জুম বৈঠক করেছে এবং কোনো সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপের বিষয়ে একমত হতে পারেনি।


হরমুজ প্রণালী ও এশিয়ার ভূমিকা:
প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক বার্নার্ড হাইকেল জানান, ইরান এখন কার্যত সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কোন জাহাজ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পার হবে আর কোনটি হবে না। এটি এই অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী আতঙ্ক। হাইকেল আরও উল্লেখ করেন যে, উপসাগরীয় তেলের প্রধান ভোক্তা চীন ও জাপানের মতো এশীয় দেশগুলোরও এখন এগিয়ে আসা উচিত। সোমালিয়া উপকূলে জলদস্যু দমনে চীন যেমন ভূমিকা রেখেছিল, এখানেও তাদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হতে পারে।

যদি মার্কিন বাহিনী কাজ শেষ না করেই পিছু হটে, তবে আরব দেশগুলো একাই ইরানের রোষানলে পড়বে, এই আতঙ্ক এখন সর্বত্র। সৌদি আরব হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যদি তাদের তেল শোধনাগার বা পানি পরিশোধন কেন্দ্রে হামলা হয়, তবে তারা পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।