সাম্প্রতিক দিনগুলোতে ইরানের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে মার্কিন-ইসরাইল জোটের ধারাবাহিক হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা উচ্চ শিক্ষার আঙিনাকে যুদ্ধের এক নতুন ফ্রন্টে পরিণত করেছে। ইরানের বিজ্ঞান মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গেলো ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত কমপক্ষে ২১টি বিশ্ববিদ্যালয় উল্লেখযোগ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তেহরানের দাবি, দেশটির বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি দুর্বল করে দিতেই বেছে বেছে শিক্ষাবিদ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। এ ধরনের হামলা বন্ধের আহবান জানানোর পাশাপাশি তেহরান সোজা ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, এখন থেকে আমেরিকা সংশ্লিষ্ট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
রাজধানী তেহরানের ‘ইরান ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি’-র বেশ কিছু ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের ভিডিও ফুটেজ মার্কিন গণমাধ্যম সিএনএন যাচাই করেছে। ভিডিওতে দেখা যায়, গত শনিবার সূর্যোদয়ের আগেই একটি গবেষণা কেন্দ্র ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং পার্শ্ববর্তী একটি ভবনে আগুন জ্বলছে।
১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহ্যবাহী প্রকৌশল বিদ্যাপীঠ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ভবনের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলেও কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তারা একে আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। এই হামলার বিষয়ে ইসরাইল কথা বললেও, পেন্টাগনের মুখে কুলুপ।
অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বৈশ্বিক নিরাপত্তা বিষয়ের অধ্যাপক জানিনা ডিল বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত বেসামরিক অবকাঠামো। যদি না এগুলো সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়, তবে এগুলোতে সরাসরি হামলা চালানো যুদ্ধাপরাধের শামিল।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, তারা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভেতরে থাকা সামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। তাদের অভিযোগ, আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট ইমাম হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়সহ বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান অস্ত্র তৈরির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, তাদের হামলায় বেশ কয়েকজন ইরানি পারমাণবিক বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন, যা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পঙ্গু করে দেওয়ার পরিকল্পনারই অংশ।
অন্যদিকে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বিষয়ক ডেপুটি মানুচেহর মোরাদি একে ‘জাতীয় অগ্রগতি এবং মানবিক মর্যাদার ওপর আঘাত’ হিসেবে বর্ণনা করে আন্তর্জাতিক মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তবে ইরানিদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক বাসিন্দা জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন জনশূন্য, মানুষ ভয় পাচ্ছে যে সেখানে আসলে কী হচ্ছে বা কেন হামলা হচ্ছে।
ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে হামলার প্রতিক্রিয়ায় তেহরানও পাল্টা হুমকির পথে হাঁটছে। তারা মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ও ইসরাইলি সংশ্লিষ্টতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আঘাত হানার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। এই হুমকির মুখে লেবানন, কাতার এবং অন্যান্য উপসাগরীয় দেশগুলোর উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
লেবানন: আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব বৈরুত এবং লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের কার্যক্রম সম্পূর্ণ অনলাইন বা রিমোট মোডে নিয়ে গেছে।
কাতার: কাতার শিক্ষা মন্ত্রণালয় যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন থেকেই দূরশিক্ষণ চালু করেছে। জর্জটাউন, টেক্সাস এঅ্যান্ডএম এবং নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মতো মার্কিন-সংশ্লিষ্ট ক্যাম্পাসগুলো বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েত: একই ধরণের সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এসব দেশে থাকা মার্কিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও।
ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক প্রধান দিনা এসফান্দিয়ারি মনে করেন, এই হামলাগুলো প্রমাণ করে যে ইসরাইলের লক্ষ্য সবসময় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ইসরাইল চায় ইরানকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দিয়ে দুর্বল করতে। তিনি আরও যোগ করেন, ইরান ধাপে ধাপে উত্তেজনার মাত্রা বাড়াচ্ছে; তারা সরাসরি উপসাগরীয় মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে হামলার হুমকি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে পিছু হটার সুযোগ দিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক সহানুভূতি ধরে রাখতে চাইলে ইরান হয়তো এখনই বড় কোনো ঝুঁকি নেবে না।
ইরানে এপ্রিলের শুরুতে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত সব ক্লাস অনলাইনে নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন এক অনিশ্চিত যুদ্ধের ছায়াতলে দিন কাটাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: সিএনএন