গত ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক বিমান ভূপাতিত হয়েছে এবং ইরানের আঘাতে দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ঘটনা ইরানের আকাশসীমায় মার্কিন আধিপত্যের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের করা দাবিগুলোকে কার্যত ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ইরান কীভাবে এত উন্নত প্রযুক্তির যুদ্ধবিমানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে সক্ষম হচ্ছে?
একটা সময় ছিল যখন ইরানের আকাশসীমায় ওড়া মার্কিন বাহিনীর জন্য ছিল অনেকটা ‘পার্কে হাঁটার মতো’ সহজ। কিন্তু সেই দিন এখন শেষ। গত ২৪ ঘণ্টায় নিখোঁজ ক্রুদের উদ্ধারে নিয়োজিত দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারও ইরানি হামলার শিকার হয়েছে।
যদিও এর মানে এই নয় যে ইরান সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সমান হয়ে গেছে, তবে এটি নিশ্চিতভাবেই তেহরানের আকাশে ওয়াশিংটনের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। শুক্রবার যেন ট্রাম্পের মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়েছে। কিন্তু পঙ্গু হয়ে যাওয়া আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে ইরান কীভাবে এসব অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান লক্ষ্যবস্তু করল?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে ইরানের ‘অপ্রতিসম যুদ্ধ’ কৌশলে, যেখানে অপ্রচলিত পদ্ধতি ব্যবহার করে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে চমকে দিচ্ছে। যুদ্ধের দ্বিতীয় মাস চললেও মার্কিন বাহিনী এখনো ইরানের ‘গুগলি’ বুঝতে পারছে বলে মনে হয় না। শুক্রবার একটি মার্কিন এফ-ফিফটিন ই স্ট্রাইক ঈগল ভূপাতিত করার পর ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) একটি নতুন ও উন্নত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এর কৃতিত্ব দিয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা পর ওই বিমানের ক্রুদের খুঁজতে যাওয়া দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টারও আক্রান্ত হয়, যদিও সেগুলো কোনোমতে ইরানি আকাশসীমা ত্যাগ করতে সক্ষম হয়েছিলো। এছাড়া কুয়েতের আকাশে বিধ্বস্ত হয়েছে আরও একটি মার্কিন এ-টেন ওয়ারহোগ যুদ্ধবিমান।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বড় ধরনের ধাক্কা। গত ২০ বছরের মধ্যে এই প্রথম শত্রুপক্ষের সরাসরি আঘাতে কোনো মার্কিন যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলো। এর আগে সবশেষ ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের সময় এমন ঘটনা ঘটেছিল। এই ঘটনাটি ট্রাম্পের সেই দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে যেখানে তিনি বলেছিলেন, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অবশিষ্ট নেই এবং আমাদের বিমানগুলো তাদের ওপর দিয়ে উড়লেও কিছুই করতে পারছে না। গত ২৪ মার্চ করা সেই দম্ভের ঠিক এক সপ্তাহ পরেই ইরান বিশ্বকে বাস্তবতা দেখিয়ে দিল।
ইরান কীভাবে মার্কিন বিমান ভূপাতিত করলো?
ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দিষ্ট কোনো অস্ত্রের নাম প্রকাশ না করলেও বিশ্লেষকদের ধারণা, এর পেছনে রয়েছে ‘মাজিদ’ ইনফ্রারেড এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম অথবা কাঁধ থেকে নিক্ষেপণযোগ্য শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র, যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ভূপাতিত বিমান দুটি সম্ভবত নিচু দিয়ে উড়ছিলো, যা সেগুলোকে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে। এমনকি গত ১৯ মার্চ আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত স্টিলথ ফাইটার এফ-থার্টি ফাইভে আঘাতের পেছনেও এই মাজিদ সিস্টেমেরই হাত ছিল বলে ধারণা করা হয়।
মাজিদ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম কেন এত ঘাতক?
২০২১ সাল থেকে ব্যবহৃত এই সিস্টেমটি মূলত নিচু দিয়ে ওড়া বিমানের বিরুদ্ধে কাজ করে। এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এটি রাডারের ওপর নির্ভর করে না। পরিবর্তে এটি ‘প্যাসিভ ইনফ্রারেড ডিটেকশন’ এবং ‘প্রক্সিমিটি ফিউজ’ ব্যবহার করে।
যেহেতু এটি কোনো রাডার সিগন্যাল নির্গত করে না, তাই কোনো বিমান এটি থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার আগে তা শনাক্ত করতে পারে না। এর পাল্লা আট কিলোমিটার দূরত্ব এবং ছয় কিলোমিটার উচ্চতা পর্যন্ত। এর ইনফ্রারেড সেন্সর ১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও লক্ষ্যবস্তু চিনতে পারে।
এমনকি এটি আধুনিক এফ-থার্টি ফাইভ থেকে নির্গত প্রচণ্ড তাপকেও লক্ষ্যবস্তু হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এই মাজিদ সিস্টেম বহু মার্কিন ও ইসরাইলি ড্রোন (যেমন এমকিউ-নাইর এবং হেরন) ধ্বংস করেছে বলে বিশ্বাস করা হয়।
মোবাইল লঞ্চার ও সুড়ঙ্গ কৌশলে পরিবর্তন
ইরান তার রণকৌশলে বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে। তারা এখন আর স্থায়ী বা ফিক্সড আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখন মাটির নিচে মিসাইল সিটি, গোপন সুড়ঙ্গ এবং দুর্গম উপকূলীয় এলাকায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিনের হামলার পরও ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার এখনো অক্ষত আছে। অথচ ইসরাইলের ধারণা ছিল ইরানের মাত্র ২০-২৫ শতাংশ লঞ্চার অবশিষ্ট আছে। আসলে গোপন গুহা এবং সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখা হাজার হাজার প্রজেক্টাইল সম্পর্কে তারা অন্ধকারে ছিল।
ইরান এখন ‘শুট-অ্যান্ড-স্কুট’ নীতি অনুসরণ করছে। তারা মোবাইল লঞ্চার দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েই দ্রুত অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলে, যার ফলে সেগুলোকে ধ্বংস করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এছাড়া ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে ৫০০টি অত্যাধুনিক ‘ভার্বা’ ম্যান-পোর্টেবল সিস্টেম সংগ্রহ করেছে যা, তাপ নিঃসরণকারী লক্ষ্যবস্তু খুঁজে বের করতে অত্যন্ত দক্ষ। বিশ্লেষকরা আরও মনে করছেন, ইরান চীনের তৈরি এইচকিউ-নাইন বি সিস্টেমও ব্যবহার করে থাকতে পারে, যা স্টিলথ বিমান এবং ইলেকট্রনিক জ্যামিং প্রতিরোধে সক্ষম।
এই সব কিছুর সমন্বয়ে অন্তত মধ্য ইরানের আকাশ এখন শত্রু বিমানের জন্য এক ‘মৃত্যুকূপ’-এ পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক এই হামলাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ইরানের আকাশে মার্কিন আধিপত্য এখন আর নিশ্চিত কোনো বিষয় নয়।
তথ্যসূত্র: সিএনএন-আল জাজিরা- ইন্ডিয়া টুডে