যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সফরকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন এক ঐতিহাসিক কূটনৈতিক তৎপরতার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের লক্ষ্যে ইরানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় অংশ নিতে একটি শক্তিশালী মার্কিন প্রতিনিধি দল এখন পাকিস্তানে।
গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম কোনো উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা পাকিস্তান সফর করছেন, যা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকেই তুলে ধরছে।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের একটি দল ইসলামাবাদে পৌঁছেছে। ভাইস প্রেসিডেন্টের এই সফর শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামানোর এক বড় ধরনের কূটনৈতিক মিশন।
এই সফরকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার দুই দিনের বিশেষ সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে এবং পুরো শহরকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে।
জেডি ভ্যান্সের নেতৃত্বে এই প্রতিনিধি দলে থাকছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। ২০১১ সালের পর ভ্যান্সই প্রথম শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা, যিনি পাকিস্তানে পা রাখছেন। বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান এবং দক্ষ কূটনীতি দেশটিকে ইরান ও আমেরিকার মধ্যে এক বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
একটা সময় ছিল যখন ওসামা বিন লাদেন হত্যাকাণ্ড কিংবা তালেবান সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে ওয়াশিংটনের চোখে ইসলামাবাদ ছিল অনেকটা কোণঠাসা। বিশেষ করে বাইডেন প্রশাসনের সময় এই দূরত্ব ছিল প্রকট। তবে ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে।
বিরল খনিজ সম্পদ এবং ভৌগোলিক গুরুত্বকে কাজে লাগিয়ে পাকিস্তান পুনরায় ট্রাম্প প্রশাসনের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। এমনকি গত বছর ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা প্রশমনে ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করে পাকিস্তান তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনীত করে এবং তার 'বোর্ড অফ পিস'-এ যোগ দেয়।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শুধু একটি আঞ্চলিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি পাকিস্তানের জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর আঘাত হেনেছে। ইরান কর্তৃক হরমুজ প্রণালী নিয়ন্ত্রণের ফলে পাকিস্তানে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়া সৌদি আরবের সঙ্গে পাকিস্তানের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকায়, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে ইসলামাবাদকেও তাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি ছিল। এই সংকট এড়াতেই পাকিস্তান কোনো জোটে নাম না লিখিয়ে নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেকে তুলে ধরেছে।
ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া এই আলোচনার ফলাফল বদলে দিতে পারে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র। পাকিস্তান কি পারবে আমেরিকা ও ইরানকে এক টেবিলে বসিয়ে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করতে? এই মিশনের সাফল্য যেমন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে পারে, ঠিক তেমনি এটি দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের কূটনৈতিক শক্তিমত্তার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে।
তথ্যসূত্র: পাকিস্তান অবজারভার