যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল বনাম ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত ছয় সপ্তাহের মধ্যে বুধবার ছিলো লেবাননের জন্য সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী দিন। এদিন ইসরায়েলি সেনাবাহিনী লেবাননজুড়ে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে, যাতে ২৫০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার ইসরাইল জানিয়েছে, এসব হামলায় তারা হিজবুল্লাহ প্রধান নাঈম কাসেমের একজন সহযোগীকেও হত্যা করেছে।
আঞ্চলিকভাবে ছড়িয়ে পড়া এই যুদ্ধে সব ফ্রন্টে উত্তেজনা কমানোর আশায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই এই হামলাগুলো চালানো হলো।
বুধবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, যার সরকার এই চুক্তিটি মধ্যস্থতা করতে সাহায্য করেছে তিনি জানান, যুদ্ধবিরতির শর্তানুযায়ী সব ফ্রন্টে আক্রমণ বন্ধ করার কথা ছিল। তিনি বিশেষভাবে লেবাননের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ইসরাইল দাবি করে, তারা ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
তবে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র এই দাবি অস্বীকার করেছে। তাদের মতে, শত্রুতা বন্ধের এই চুক্তিটি শুধু যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং ইরানের মধ্যকার সরাসরি আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে ইসরাইলি হামলা একটি ‘আলাদা বিষয়’।
সাম্প্রতিক এই সহিংসতা যুদ্ধবিরতির আওতা নিয়ে গভীর মতভেদ ও বিভ্রান্তি প্রকাশ করে দিয়েছে। এর ফলে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, স্থায়ী সমাধানের জন্য আগামী শনিবার ইসলামাবাদে নির্ধারিত আলোচনা শুরু হওয়ার আগেই এই শান্তিপ্রক্রিয়া ভেস্তে যেতে পারে।

যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর লেবাননে ইসরাইল কী ধরনের হামলা চালিয়েছে?
বুধবার যুদ্ধবিরতি ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পরই ইসরাইল গত ২ মার্চের পর সবচেয়ে ব্যাপক আক্রমণ শুরু করে। তারা দেশজুড়ে ১০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে। লেবাননের সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, বৈরুত, বেকা উপত্যকা এবং দক্ষিণ লেবাননের জনবহুল এলাকাগুলোতে চালানো বিমান হামলায় অন্তত ২৫৪ জন নিহত এবং ১,১৬৫ জন আহত হয়েছেন।
লেবানিজ চিকিৎসকদের সংগঠনের প্রধান ইলিয়াস শ্লেলা এক লিখিত বিবৃতিতে সব বিভাগের চিকিৎসকদের জরুরি ভিত্তিতে নিকটস্থ হাসপাতালে গিয়ে সাহায্যের আহ্বান জানিয়েছেন। বৈরুতের অন্যতম বড় একটি হাসপাতাল জানিয়েছে, তাদের সব গ্রুপের রক্তের জরুরি প্রয়োজন।
জাতিসংঘ এই হতাহতের সংখ্যাকে ‘ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছে এবং মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্ক এই ধ্বংসযজ্ঞকে ‘নৃশংস’ বলে অভিহিত করেছেন। ইসরায়েল কোনো প্রমাণ ছাড়াই দাবি করেছে যে, তারা হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তবে লেবাননের কর্মকর্তা ও সাহায্য সংস্থাগুলো জানিয়েছে, পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে, হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে পড়ছে এবং জরুরি সেবা সংস্থাগুলো পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
লেবাননের পার্লামেন্ট স্পিকার নাবিহ বেরি জনবহুল এলাকায় এই হামলাকে ‘পুরোদস্তুর যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, আজকের এই অপরাধ এমন এক সময়ে ঘটল যখন অঞ্চলে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়েছে, যে চুক্তি ইসরাইল এবং তার রাজনৈতিক কাঠামো মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছে।

যুদ্ধবিরতিতে জড়িত দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া কী?
বর্তমানে প্রধান কূটনৈতিক বিতর্কটি হলো লেবানন এই যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত কি না। যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরাইল এবং পাকিস্তানের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
বুধবার এক পোস্টে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শরিফ লিখেছেন, আমি অত্যন্ত আনন্দের সাথে ঘোষণা করছি, ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের মিত্রদের সাথে অবিলম্বে সব জায়গায় আক্রমণ বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে, যার মধ্যে লেবানন এবং অন্যান্য স্থানও অন্তর্ভুক্ত এবং এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। পাকিস্তান এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি অর্জনে প্রধান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে।
ইরানও জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত এবং তারা যুক্তরাষ্ট্রকে সেই অনুযায়ী এটি কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছে। শরিফের ঘোষণা উদ্ধৃত করে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন যুদ্ধবিরতি বা ইসরাইলের মাধ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। তারা দুটিই একসাথে পেতে পারে না। বিশ্ব লেবাননের গণহত্যা দেখছে। এখন বল যুক্তরাষ্ট্রের কোর্টে।
বিপরীতে, মার্কিন কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এই যুদ্ধবিরতিতে লেবানন অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন, তখন তিনি একে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে ‘শত্রুতার সম্পূর্ণ অবসান’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তবে, পরে তিনি স্পষ্ট করেন, লেবানন একটি ‘আলাদা সংঘর্ষ’।
এই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন জেডি ভ্যান্সও, যিনি শনিবার ইসলামাবাদে ইরানের সাথে আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন। তিনি হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে সাংবাদিকদের বলেন, আমি মনে করি ইরান ভেবেছিল লেবানন যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত, কিন্তু আসলে তা ছিল না।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও একই সুরে বলেছেন যে, এই চুক্তি লেবাননে ইসরায়েলকে বাধ্য করে না এবং হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ইরান কেন লেবাননকে আলোচনার অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানাচ্ছে?
জেডি ভ্যান্স বলেছেন, লেবানন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে প্রস্তাবিত আলোচনা ঝুঁকিতে ফেলা ইরানের জন্য ‘বোকামি’ হবে। কারণ তার মতে, লেবাননের সাথে ইরানের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু ভ্যান্সের দাবির বিপরীতে লেবাননের সাথে ইরানের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। হিজবুল্লাহ তেহরানের সবচেয়ে শক্তিশালী আঞ্চলিক মিত্র এবং প্রতিরোধ অক্ষের কেন্দ্রীয় অংশ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহ এই যুদ্ধে সরাসরি জড়িয়ে পড়ে।
বিশ্লেষকদের মতে, লেবাননকে বাদ দিয়ে যুদ্ধবিরতি হলে তা ইরানের কয়েক দশকের প্রতিরক্ষা কৌশলকে দুর্বল করে দেবে। যদি ইরান শান্ত থাকে কিন্তু তার মিত্র হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চলতে থাকে, তবে তেহরান তার আঞ্চলিক প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। মূলত হিজবুল্লাহর সাথে ইরানের সম্পর্ক ছিন্ন করাই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দাবি, যা ইরান মেনে নিতে চায় না।
কিংস কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ লেবাননকে এই যুদ্ধবিরতির ‘একিলিস হিল’ বা সবচেয়ে দুর্বল জায়গা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, লেবাননের পরিস্থিতি ইরানকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নিতে বাধ্য করতে পারে, যাতে তারা প্রমাণ করতে পারে যে তারা হিজবুল্লাহর একজন নির্ভরযোগ্য নিরাপত্তা অংশীদার।

বিশ্বের অন্যান্য শক্তিগুলো কী বলছে?
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া মূলত লেবাননে ইসরায়েলি হামলার নিন্দা এবং লেবাননকে যুদ্ধবিরতির অন্তর্ভুক্ত করার দাবির ওপর কেন্দ্রীভূত হয়েছে। কাতার এই হামলাকে ‘নৃশংস’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। মিশর বলেছে, এই হামলা প্রমাণ করে যে ইসরায়েল শান্তি প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করতে চায়। তুরস্ক বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষায় দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি নেতানিয়াহুর এই অবজ্ঞা ‘অসহনীয়’। ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও হামলার নিন্দা জানিয়ে লেবাননকে যুদ্ধবিরতির আওতায় আনার দাবি তুলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শীর্ষ কূটনীতিক কাজা ক্যালাস এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও ইসরাইলকে হামলা বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এক বিবৃতিতে সতর্ক করেছেন যে, লেবাননে চলমান সামরিক তৎপরতা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতির জন্য এক ‘গুরুতর ঝুঁকি’ তৈরি করছে।
