মালিতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভয়াবহ হামলা, গুলি ও বিস্ফোরণ

শনিবার ভোরে মালির রাজধানী বামাকোসহ দেশটির বিভিন্ন প্রান্তে এক ভয়াবহ ও সুসংগঠিত হামলার খবর পাওয়া গেছে। রাজধানী বামাকোর উপকণ্ঠে অবস্থিত দেশটির প্রধান সামরিক ঘাঁটি কাতিতে শক্তিশালী বিস্ফোরণ এবং একটানা গুলির শব্দে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় পুরো এলাকা।

একই সময়ে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলেও বড় ধরনের হামলার খবর পাওয়া গেছে, যাকে বিশ্লেষকরা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘জিহাদি হামলা’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।

মালির সেনাবাহিনীর দেয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, শনিবার ভোরে বেশ কিছু অজ্ঞাত ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ রাজধানী এবং দেশের গুরুত্বপূর্ণ কিছু অবস্থানে একযোগে আক্রমণ চালায়।

প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ভোর ৬টার কিছু আগে কাতি সামরিক ঘাঁটির কাছে দুটি বিশাল বিস্ফোরণ ঘটে এবং এরপরই শুরু হয় প্রবল গোলাগুলি। হামলার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে, নিরাপত্তার খাতিরে রাজধানীর মদিবো কেইতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চারপাশের রাস্তাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং সমস্ত ফ্লাইট বাতিল করা হয়। এছাড়া মধ্যাঞ্চলের সেভারে এবং উত্তরাঞ্চলের গাও ও কিদালে একই ধরনের সমন্বিত হামলার খবর পাওয়া গেছে।

মালির সেনাবাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার দাবি করলেও অসমর্থিত সূত্রমতে এখনো লড়াই চলছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং নিরাপত্তা সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই হামলায় আল-কায়েদার অনুসারী জঙ্গি গোষ্ঠী 'জামাত নুসরাত আল-ইসলাম ওয়াল-মুসলিমিন' এবং তুয়ারেগ বিদ্রোহী গোষ্ঠী 'আজাওয়াদ লিবারেশন ফ্রন্ট' সরাসরি জড়িত।

এফএলএ’র একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, তাদের বাহিনী কিদাল ও গাও অঞ্চলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করে নিয়েছে। যদিও এই দাবির সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

২০২০ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা জেনারেল আসিম গোইতার নেতৃত্বাধীন জান্তা সরকারের জন্য এই হামলা এক বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি।

মালির বর্তমান সরকার জাতিসংঘ শান্তি মিশন এবং ফরাসি বাহিনীকে বিদায় করে দিয়ে নিরাপত্তার দায়িত্ব দিয়েছিল রাশিয়ার ভাড়াটে যোদ্ধাদের। বামাকো বিমানবন্দরের কাছে রুশ বাহিনীর একটি ক্যাম্প লক্ষ্য করেও শনিবার গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

মালির এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে দেশটিতে থাকা মার্কিন দূতাবাস তাদের নাগরিকদের নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দিয়েছে। উল্লেখ্য, মালি সম্প্রতি নাইজার ও বুরকিনা ফাসোর সাথে মিলে ‘অ্যালায়েন্স অফ সাহেল স্টেটস’ গঠন করে পশ্চিম আফ্রিকার জোট ইকোওয়াস থেকে বেরিয়ে এসেছে।

প্রতিবেশী দেশগুলো যখন একটি অভিন্ন বাজার ও মুদ্রার স্বপ্ন দেখছে, ঠিক তখনই এই ভয়াবহ হামলা পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে সামনে নিয়ে এল।

মালির উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের বিশাল এলাকা এখনো সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। একদিকে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর দাপট, অন্যদিকে জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা—এই দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে মালির সাধারণ মানুষের জীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

সূত্র: বিবিসি-রয়টার্স