সমৃদ্ধ ইউরোনিয়াম সমর্পণে ইরানের প্রতি ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধাবসানের আলোচনার মাঝেই নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত ও তীব্র বাগযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান। মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পোস্টে ইরানকে তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বা তাঁর ভাষায় ‘পরমাণু ধূলিকণা’ অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দেওয়ার চরম হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

ট্রাম্পের এই কড়া বার্তা এমন এক সময়ে এলো, যখন দক্ষিণ ইরানের কৌশলগত বন্দর নগরী বন্দর আব্বাসে নতুন করে ‘আত্মরক্ষা’র নামে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এর ফলে গত ৮ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া দুই দেশের মধ্যকার অত্যন্ত ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।

ট্রাম্প তাঁর দীর্ঘ পোস্টে স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হয় অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে যাতে তা দেশে এনে ধ্বংস করা যায়, অথবা সবচেয়ে ভালো হয় যদি ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের সাথে যৌথ সমন্বয়ের মাধ্যমে তাদের নিজেদের মাটিতেই তা ধ্বংস করে ফেলা হয়। আর এই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশন বা সমমানের কোনো সংস্থার প্রত্যক্ষ নজরদারিতে।

Iran War 01
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে, তাঁর প্রধান লক্ষ্য হলো ইরানকে পারমাণবিক বোমা তৈরি করা থেকে বিরত রাখা, যদিও তেহরান সবসময়ই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পরিকল্পনা অস্বীকার করে আসছে। ট্রাম্পের উল্লিখিত সংস্থাটি অবশ্য ১৯৭৪ সালেই বিলুপ্ত করা হয়েছিল, তবে তাঁর এই বার্তাটি চলমান শান্তি আলোচনার অংশ কি না, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

এই পারমাণবিক হুঁশিয়ারির মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগেই দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাস এলাকায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। সেন্টকমের মুখপাত্র টিম হকিন্স এক বিবৃতিতে জানান, ইরানি বাহিনীর হুমকি থেকে মার্কিন সেনাদের রক্ষা করতে এবং আত্মরক্ষার্থেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

মূলত হরমুজ প্রণালীতে অবস্থিত ইরানের নৌঘাঁটির কাছাকাছি এলাকায় মাইন স্থাপনের চেষ্টায় লিপ্ত থাকা ইরানি স্পিডবোট এবং বেশ কয়েকটি মিসাইল উৎক্ষেপণ কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে এই নিখুঁত আঘাত হানা হয়।

US strikes on Iran
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস বিমানবন্দরের কাছে তিনটি বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে এবং শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তু প্রতিহত করতে তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করা হয়েছিল। এছাড়া পারস্য উপসাগরের সিরিক ও জাস্ক এলাকার কাছেও একই রকম বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন আগ্রাসনের পর ইরানের নবনিযুক্ত কট্টরপন্থী সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের নেতা মোহাম্মদ বাঘের জোলঘাদর দেশের মানুষের উদ্দেশ্যে দেওয়া তাঁর প্রথম বার্তায় সোজা জানিয়ে দিয়েছেন, আমেরিকা ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইরান এক চুলও পিছু হটবে না।

তিনি বলেন, আমাদের সামরিক ক্ষেত্র, কূটনৈতিক ক্ষেত্র এবং রাজপথের বীর জনতা তাদের সাহসী প্রতিরোধের মাধ্যমে শত্রুকে হাঁটু গেড়ে বসতে বাধ্য করেছে। তবে এই নতুন হামলা সত্ত্বেও দোহার মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যকার পর্দার অন্তরালের শান্তি আলোচনা এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি।

Iran War 04
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদুলনাসের হেম্মাতি বর্তমানে কাতারের প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা চালাচ্ছেন। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই জানিয়েছেন, আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হলেও যুদ্ধ বন্ধের চূড়ান্ত চুক্তি এখনই আসন্ন, এমনটা বলা যায় না।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহার এই আলোচনা মূলত হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া, ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং বিদেশে আটকে থাকা প্রায় ২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত করার বিষয়ে আবর্তিত হচ্ছে। তবে শান্তি চুক্তির আলোচনাকে আরও জটিল করে তুলেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

সোমবার তিনি এক দীর্ঘ পোস্টে দাবি করেছেন, ইরানের সাথে যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির পাশাপাশি সৌদি আরব, পাকিস্তান, কাতার, মিশর, তুরস্ক এবং জর্ডানের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এ সই করতে হবে এবং ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে হবে। ট্রাম্পের এই শর্ত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক জন্ম দিয়েছে।

US base in middle east 03
কারণ, কাতার এবং সৌদি আরবের মতো প্রভাবশালী দেশগুলো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ফিলিস্তিনকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেয়া পর্যন্ত তারা কখনোই ইসরাইলের সাথে কোনো সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ চুক্তিতে যাবে না। একই অবস্থান পাকিস্তানেরও, যাদের সাথে ইসরাইলের কোনো কূটনৈতিক সম্পর্কই নেই। ফলে একদিকে মার্কিন সামরিক হামলা এবং অন্যদিকে ট্রাম্পের অবাস্তব শর্তের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকটময় পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও এনডিটিভি