হরমুজে ইরান-আমেরিকার তুমুল টক্কর, হুমকিতে যুদ্ধবিরতি

ফুটবল বিশ্বকাপকে সামনে রেখে যখন ইরান ও আমেরিকার মধ্যে মাঠের বাইরের বরফ গলার আভাস মিলছিল, ঠিক তখনই শনিবার মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ঘটল চরম বিস্ফোরণ। হরমুজ প্রণালীতে ইরানের চালিত ড্রোন ভূপাতিত করার পর দেশটির উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলোতে পাল্টা ভয়াবহ বিমান হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী। এই নতুন সামরিক সংঘাত তিন মাস ধরে চলা এই যুদ্ধ অবসানের সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক মাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, ইরান হরমুজ প্রণালীর দিকে চারটি ড্রোন ছুড়েছিল, যা ওই অঞ্চলের বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো হয় বলে ওয়াশিংটনের ধারণা। মার্কিন বাহিনী ড্রোনগুলো আকাশেই ধ্বংস করার পর হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত পয়েন্ট গোরুক এবং কেশম দ্বীপে অবস্থিত ইরানের নজরদারি ও রাডার সাইটগুলোতে তীব্র হামলা চালায়।

এর জবাবে ইরানও মার্কিন ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল বর্ষণ করে। তবে মার্কিন বাহিনীর দাবি, ইরানের ছড়া ৬টি মিসাইল তারা আকাশেই আটকে দিয়েছে এবং সপ্তম মিসাইলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।

US Iran War 04
ভঙ্গুর শান্তি আলোচনা ও তেলের বাজারের অস্থিরতা:  
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন ও ইসরাইলি যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ থামাতে বেশ কিছুদিন ধরে পাকিস্তান ও অন্যান্য দেশের মধ্যস্থতায় একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির চেষ্টা চলছে। এই আলোচনার মাঝেই আজ ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি আজ শনিবারই জরুরি সফরে তেহরান পৌঁছাচ্ছেন। তবে ইসলামাবাদ এখনও এই সফরের আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ করেনি।

যুদ্ধ থামাতে তেহরানের শর্ত খুবই স্পষ্ট। তারা আমেরিকার অবরুদ্ধ করে রাখা কোটি কোটি ডলারের তেলের রাজস্ব ফেরত চায়, অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং তাদের বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন ব্লকেড বা অবরোধ তুলে নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

বর্তমানে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ সরবরাহকারী এই হরমুজ প্রণালী ইরান কার্যত বন্ধ করে রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি গতকাল শুক্রবার সতর্ক করে জানিয়েছে, জ্বালানি ও পরিবহন খরচ বাড়ার কারণে বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ চরম অনাহার ও দুর্ভিক্ষের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

US Iran War 03
ঘরোয়া চাপে ট্রাম্প
, অনড় তেহরান: জ্বালানি তেলের লাগামহীন দাম বৃদ্ধির কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন দেশের ভেতরে তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছেন। মার্কিন জনগণ এই অপ্রিয় যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার দাবি জানাচ্ছে। এনবিসি নিউজের ‘মিট দ্য প্রেস’ অনুষ্ঠানে ট্রাম্প দাবি করেন, আমেরিকার হামলায় ইরানের অধিকাংশ ড্রোন ও মিসাইল তৈরির কারখানা ধ্বংস হয়ে গেছে।

তবে এখনও তাদের হাতে প্রায় ২১ থেকে ২২ শতাংশ মিসাইল অক্ষত রয়েছে। ইরানের নেতারা কেন শান্তি চুক্তিতে রাজি হচ্ছেন না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, কারণ তারা শক্তিশালী এবং অহংকারী। তারা কখনোই ভাবেনি যে এই কাজগুলো তাদের করতে হবে, কিন্তু এখন তাদের আর কোনো উপায় নেই। তাই চুক্তি করতে একটু সময় লাগছে।

অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতার উপদেষ্টা মোহসেন রেজাই সিএনএনকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প প্রশাসন যদি ইরানের ফ্রিজ করে রাখা ২৪ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ ছেড়ে না দেয়, তবে কোনো শান্তি চুক্তি হবে না। তিনি বলেন, আমেরিকা যদি আবার আক্রমণ শুরু করে, তবে তারা এক অন্ধকার সুড়ঙ্গে প্রবেশ করবে।

US Iran War 05
লেবাননেও ছড়াচ্ছে যুদ্ধের আগুন:  
মূল যুদ্ধের সমান্তরালে লেবানন সীমান্তেও সংঘাতের আগুন দাউদাউ করে জ্বলছে। ইরান-পন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ গতকাল দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের ওপর দুটি বড় হামলা চালিয়েছে। এর জবাবে ইসরায়েলও দক্ষিণ লেবাননের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলা চালিয়েছে। ইরান স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ওয়াশিংটনের সাথে কোনো শান্তি চুক্তি করতে হলে লেবানন থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং হিজবুল্লাহর সাথে যুদ্ধবিরতি করতে হবে।

তবে হিজবুল্লাহর বর্তমান প্রধান নাইম কাসেম আমেরিকার মধ্যস্থতায় হওয়া লেবানন সরকার ও ইসরায়েলের একটি খসড়া চুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন, কারণ সেখানে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের কোনো শর্ত ছিল না। মার্কিন প্রশাসনের সাথে টানাপোড়েন বাড়লেও ইসরায়েল সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তারা লেবাননে সামরিক অভিযান বন্ধ করবে না। মাঠের এই ত্রিমুখী সংঘাত আসন্ন বিশ্বকাপ এবং বৈশ্বিক শান্তি উভয়কেই এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড় করিয়ে দিল।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স ও আল জাজিরা