তিন মাস পেরিয়ে মার্কিন-ইরান রক্তক্ষয়ী সংঘাত যখন আগামী সপ্তাহে শততম দিনে পদার্পণ করতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশজুড়ে শুরু হয়েছে এক প্রলয়ঙ্কারী ড্রোন ও মিসাইল যুদ্ধ। শনিবারের এই পাল্টাপাল্টি হামলা দুই দেশের মধ্যকার ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এবার যুদ্ধের সরাসরি আঁচ লেগেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যতম দুই দেশ কুয়েত এবং বাহরাইনে।
শনিবার স্থানীয় সময় ভোরে কুয়েতের আকাশে একের পর এক রকেট ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করার রোমাঞ্চকর দৃশ্য দেখা যায় এবং একই সময়ে বাহরাইনজুড়ে বাজতে থাকে বিমান হামলার সতর্কীকরণ সাইরেন। এই ঘটনার পরপরই ইরানের সামরিক মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাগারি সাম্প্রতিক এই উত্তেজনার জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন।
তিনি কুয়েতগামী সবযাত্রীবাহী বিমানকে জরুরি ভিত্তিতে রুট পরিবর্তনের পরামর্শ দেন এবং কুয়েতের নাগরিকদের বিমানবন্দর এলাকা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান। বিমান চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ফ্লাইটরাডার২৪’-এর তথ্য অনুযায়ী, হামলার পর কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ২৪টি ফ্লাইট বাতিল এবং ১৫টি ফ্লাইট বিলম্বিত হয়েছে। অনেক বিমানকে মাঝআকাশে হোল্ডিংয়ে রাখা হয়েছে অথবা অন্য দেশে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে মুহূর্তের মধ্যেই কুয়েতের আকাশসীমা সম্পূর্ণ ফাঁকা হয়ে যায়।

মার্কিন ঘাঁটি ও পঞ্চম নৌবহর লক্ষ্য করে হামলা: আমেরিকার দাবি, শুক্রবার হরমুজ প্রণালীতে ইরানের ৪টি ‘ওয়ান-ওয়ে’ বা আত্মঘাতী ড্রোন ধ্বংস করার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কুয়েত ও বাহরাইন লক্ষ্য করে ৭টি ব্যালিস্টিক মিসাইল ছোড়ে ইরান। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ইরানের ছোড়া ৬টি মিসাইল আকাশেই ধ্বংস করেছে এবং সপ্তম মিসাইলটি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই হামলায় কোনো মার্কিন সেনার হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর ৫ম নৌবহরের সদর দপ্তর ধ্বংস করার যে দাবি ইরান করেছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘ইরনা’ জানিয়েছে, দেশটির শক্তিশালী রেভোলিউশনারি গার্ডস কুয়েতের ‘আলি আল সালেম’ মার্কিন বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনের মার্কিন পঞ্চম নৌবহরকে লক্ষ্য করেই এই নিখুঁত হামলা চালিয়েছে। উল্লেখ্য, এর মাত্র একদিন আগেই কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলায় একজন ভারতীয় নাগরিক নিহত এবং ডজনখানেক মানুষ আহত হন।

সমুদ্রে মার্কিন অবরোধ ও নতুন নিষেধাজ্ঞা: মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরান যে ড্রোন ও মিসাইলগুলো ছুড়েছিল, তা ওই অঞ্চলের আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য সরাসরি হুমকি ছিল। এর জবাবে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালী ও পারস্য উপসাগরের সুরক্ষায় ইরানের গোরুক শহর এবং কেশম দ্বীপে অবস্থিত উপকূলীয় নজরদারি রাডার স্টেশনগুলোতে ব্যাপক বোমাবর্ষণ করে।
শুধু আকাশেই নয়, সমুদ্রেও শুরু হয়েছে মার্কিন অভিযান। ভারত মহাসাগরে ইরানের সাথে সম্পৃক্ত এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞায় থাকা এক তেলের ট্যাঙ্কারে জোরপূর্বক চড়ে বসেছে মার্কিন নৌবাহিনী, যাতে ইরান তেল বিক্রি করে যুদ্ধ তহবিলের মুনাফা তুলতে না পারে। একই সাথে ওয়াশিংটন ইরানের জ্বালানি খাতের ওপর চাপ বাড়াতে একঝাঁক নতুন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও ট্যাংকারের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

ট্রাম্পের অনড় অবস্থান ও তেলের বাজারের সংকট: এসব হামলা ও উত্তেজনার মধ্যেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী মনোভাব দেখিয়েছেন। শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ট্রাম্প বলেন, ইরানের সাথে পরিস্থিতি বেশ ভালোভাবেই এগিয়ে চলছে। তবে ইরান যে এখনও যুদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে, তা স্বীকার করে ট্রাম্প বলেন, তাদের কাছে এখনও কিছু মিসাইল এবং ড্রোন রয়েছে। যদি শতকরা হিসেবে বলি, তবে তাদের মোট মিসাইলের হয়তো ২১ বা ২২ শতাংশ এখনও অক্ষত আছে।
বর্তমানে মার্কিন প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও সামরিক অবরোধ জারি রেখেছে, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। তেলের এই লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি আমেরিকার অভ্যন্তরে ট্রাম্পের জন্য তীব্র রাজনৈতিক মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, ওয়াশিংটনের প্রতি চরম ‘অবিশ্বাস’ প্রকাশ করে ইরান কোনো ধরণের সমঝোতায় আসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। শততম দিনের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধ এখন শুধু দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাবিপর্যয়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্রধ এএফপি-এনডিটিভি
