ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ এখন এক জটিল রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তির লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ এড়ানোর পাশাপাশি একে অপরের ওপর সর্বোচ্চ চাপ সৃষ্টি করার এই কৌশলী খেলায় মেতেছে দুই দেশই।
গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হলেও মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে উত্তেজনা এখনও তুঙ্গে। বিশেষ করে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানের কারণে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে কোনো স্থায়ী শান্তি চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন না বিশেষজ্ঞরা।
মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জন ক্যালাব্রিস বলেন, এই সংঘাত এখন স্পষ্টতই একে অপরকে রাজনৈতিকভাবে টেক্কা দেওয়ার লড়াই। দুই পক্ষই অত্যন্ত সাবধানে সামরিক উত্তেজনার পারদ নিয়ন্ত্রণ করছে, যাতে পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে না যায়। তারা একে অপরকে সামরিকভাবে ধ্বংস করার চেয়ে বরং কে কত বেশি সময় টিকে থাকতে পারে, সেই চেষ্টাই করছে।
ইরানের সংসদ স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফও বিষয়টিকে 'ইচ্ছাশক্তির যুদ্ধ' হিসেবে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, তেহরান কোনো ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধ বা চাপের মুখে মাথা নত করবে না। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, চুক্তি করার জন্য তাঁর কোনো তাড়া নেই এবং তেহরানের ওপর চাপ বজায় রাখার মতো যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের হাতে রয়েছে।

আগামী দিনগুলোতে সম্ভাব্য তিনটি পরিস্থিতি
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ রায়ান বোল আগামী মাসগুলোতে এই সংকটের তিনটি সম্ভাব্য রূপরেখা তুলে ধরেছেন:
প্রথম এবং সবচেয়ে জোরালো সম্ভাবনা হলো, বর্তমানের এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত হওয়া, যা মূলত ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ এমন এক অনিশ্চিত অবস্থা। এই পরিস্থিতিতে দুই দেশই বড় কোনো যুদ্ধে না জড়িয়ে সীমিত আকারে পরোক্ষ হামলা, উসকানি এবং অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখবে। এর ফলে হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধই থাকবে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে ছোটখাটো হামলা অব্যাহত থাকতে পারে।
দ্বিতীয় এবং তুলনামূলক আশাবাদী পরিস্থিতিটি হলো, উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়া। এর মাধ্যমে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়বে এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে ভবিষ্যৎ আলোচনার একটি পথ তৈরি হবে। এই পরিস্থিতি তৈরি হলে হরমুজ প্রণালীর সংকট আগস্টের শেষের দিকে স্বাভাবিক হতে শুরু করতে পারে।
তৃতীয় এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হলো, পুনরায় পুরোদমে যুদ্ধ শুরু হওয়া। লেবানন সংকটের জেরে ইসরাইলের ওপর ইরানের বড় কোনো হামলা, মার্কিন সেনার প্রাণহানি, উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি পরিকাঠামো ধ্বংস বা ওয়াশিংটন-ইসরাইলের যৌথ সামরিক অভিযান এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে আবারও ভয়াবহ যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে। মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে পুরোপুরি সরে না যাওয়া পর্যন্ত এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

ছাড় দিতে নারাজ কোনো পক্ষই
প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক মেরিনা মিরন মনে করেন, এই মুহূর্তে কোনো পক্ষই বড় কোনো ছাড় দিতে রাজি নয়। তবে ইরানের কর্মকর্তারা এমন একটি অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার কথা ভাবছেন যা তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করবে এবং আটকে থাকা রাজস্বের পথ খুলে দেবে। কিন্তু ওয়াশিংটন তেহরানের এই প্রস্তাব মেনে নেবে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন, তাই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি নিয়ে তাঁর কোনো তাড়া নেই। অন্য দিকে, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট সত্ত্বেও ইরানের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা এ ধরণের চাপ আরও কয়েক বছর রাজনৈতিকভাবে সামলে নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এছাড়া, লেবাননে হিজবুল্লাহর দুর্বলতা ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করায় শান্তি আলোচনার সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

যুদ্ধের চাবিকাঠি এখন অর্থনীতি
লন্ডনের কিংস কলেজের গবেষক মেরিনা মিরন উল্লেখ করেন, সংঘাতের কৌশলগত স্তরে সামরিক শক্তির পাশাপাশি অর্থনীতিকে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল ও জ্বালানি বাজারকে হুমকির মুখে ফেলে তেহরান মূলত আমেরিকার রাজনৈতিক ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।
জন ক্যালাব্রিস মনে করেন, ইরান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক ও মার্কিন বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকায় তাদের অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করার ক্ষমতা আমেরিকার চেয়ে অনেক বেশি। দমনপীড়ন এবং সমান্তরাল অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করে তারা টিকে রয়েছে। কিন্তু আমেরিকার পরিস্থিতি ভিন্ন, সেখানে গণতান্ত্রিক পরিবেশের কারণে জনগণের মতামত অত্যন্ত সংবেদনশীল।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনকে হোয়াইট হাউসের জন্য একটি গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে মার্কিন অর্থনীতি এবং এই যুদ্ধ নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। ফলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও রাজনৈতিকভাবে সুরক্ষিত, আর আমেরিকা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এই বিপরীতমুখী অবস্থানই বর্তমান সংকট সমাধানের পথকে সবচেয়ে বেশি অবরুদ্ধ করে তুলেছে।
তথ্যসূত্র: আনাদোলু এজেন্সি
